বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্পোর্টস ট্যুরিজম

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্পোর্টস ট্যুরিজম

 

ঢাকা ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ :

 

অনাদিকাল থেকে, খেলাধুলা বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে অনুপ্রেরণা, সম্প্রীতি ও শান্তির উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ক্রীড়া পর্যটন উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, যা বিমানবন্দর, রাস্তা, স্টেডিয়াম, ক্রীড়া কমপ্লেক্স, হোটেল এবং রেস্তোরাঁর মতো অবকাঠামো প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগকে উদ্দীপিত করতে পারে – এমন প্রকল্প যা স্থানীয় জনগণ এবং সেইসাথে দর্শকদের জন্য উপভোগ্য হয়।

বাংলাদেশে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের জনপ্রিয় খেলা ও খেলার আয়োজন করা হয়। দেশের যেকোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ বা ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন শত শত মানুষ উৎসাহের সাথে দেখেন এবং উপভোগ করেন।

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক উন্নয়নের বাহক হিসেবে ক্রীড়া ইভেন্ট গুলা ব্যাপকভাবে আলোচিত। ক্রীড়া ইভেন্টগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে একটি হল এটি একটিদেশকে তার পর্যটনীয় আকর্ষণ বিশ্বের অন্যান্য অংশে প্রচার করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান আয়োজনে দেশগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে তারা প্রোগ্রামগুলিকে যতটা সম্ভব আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করে।দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০ ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করে বিশ্ব মনোযোগ আকর্ষণে সফল হয়েছে।

চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া, ফ্রান্স, জাপান ও ব্রাজিলের মতো বিশ্ব অর্থনৈতিক জায়ান্টরা সকলেই  অলিম্পিক গেমস, কমনওয়েলথ গেমস, ফিফা বিশ্বকাপ এবং শীতকালীন অলিম্পিকের মতো মেগা স্পোর্টস ইভেন্টের আয়োজন করেছে। সুযোগ সুবিধার কাঠামো এবং নির্দিষ্ট গেমের জন্য তৈরি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা তাদের একই ইভেন্ট আবার আয়োজনের প্রেরণা দেয়। শুধু তাই নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আয়োজক হিসেবে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ইভেন্ট   আয়োজনের  জন্য বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। পরিসংখ্যান বলছে যে খেলাধুলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ বৃহত্তম শিল্প, বার্ষিক ৬৫০ বিলিয়ন ডলার উপার্জন এবং ক্রীড়া বিজ্ঞাপনের জন্য ২৭.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে।

পাঁচ বছরে প্রত্যাশিত বিশ্ব ক্রীড়া শিল্পের প্রবৃদ্ধি হবে ২১ বিলিয়ন ডলার । বিশ্বব্যাপী বিশেষ ইভেন্টের জন্য বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ৫০০ বিলিয়ন ডলার। পর্যটন শিল্প দেশটির অর্থনীতিতে  বার্ষিক ৮১২.৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি অবদান রাখে এবং ১২৪ বিলিয়ন ডলার কর রাজস্ব তৈরি করে এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প। নিউ জার্সির প্রতি নয়জন শ্রমিকের মধ্যে একজনের মোট ৪,৭০,০০০ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাকরি সহ পর্যটনে একটি চাকরি রয়েছে, যা মোট কর্মসংস্থানের ১১.৪% এবং মজুরি ও বেতনের প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। ইভেন্ট, খেলাধুলা এবং বিনোদন খাতে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশিত বৃদ্ধির হার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনুসারে ৪৪%।

খেলাধুলা এবং খেলাধুলার ইভেন্ট অর্থনীতিতে ভিন্নভাবে অবদান রাখতে পারে। যেহেতু আমাদের অর্থনীতি বিভিন্ন খাতে উন্নতি করছে সেহেতু আমাদের বিবেচনা করতে হবে যে কীভাবে আমরা আমাদের জনগণের উন্নতির জন্য ক্রীড়া ইভেন্টগুলিকে কাজে লাগাতে পারি তা কেবল উল্লিখিত ইভেন্টগুলিকে কয়েক দিনের বিনোদনমূলক প্রোগ্রামে পরিণত করা যাতে বিপুল পরিমাণ জনসাধারণের অর্থের অপচয়ের কারণ  হয়। ক্রীড়া ইভেন্টগুলি  সাধারণত একাধিক উদ্দেশ্য পূরণের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাদের মধ্যে একটি হল দেশগুলির পর্যটনের আকর্ষণ এবং সংস্থানগুলোকে তুলে ধরা। আমরা জানি যে পর্যটনকে একটি বিশাল খাতে  পরিণত করতে হবে যা লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ আংশিকভাবে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের মতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজন করতে এবং ভারত ও শ্রীলংকার সাথে যৌথভাবে ২০১১ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপের মত বড় মহোৎসব আয়োজনে সফল হয়েছে। এটি একটি গর্বের বিষয় যে বাংলাদেশ এমন একটি মেগা ইভেন্ট অত্যন্ত বর্ণাঢ্যভাবে আয়োজন করতে সফল হয়েছে যা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলি স্বপ্ন দেখার সাহস করে। সাকিব আল হাসান বিশ্বক্রিকেটে এবং মাবিয়া আক্তার দক্ষিণ এশীয় অলিম্পিকে ভারোত্তলনে স্বর্ণপদকে লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তুলে ধরছেন বিশ্বের দরবারে।

বাংলাদেশ বিশ্ব পর্যটন বাজারে প্রবেশের  চেষ্টা করছে এবং এ জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে যেমন কক্সবাজারকে ঘিরে মহাপরিকল্পনা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে পর্যটন মেলা আয়োজন ইত্যাদি। কিন্তু স্পোর্টস ইভেন্টের মাধ্যমে পর্যটন প্রচারের সবচেয়ে সহজ উপায়টি এখনো অনুপস্থিত। ক্রীড়া ইভেন্টগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্বের মনযোগ আকর্ষণ করে, বিশেষ করে অংশগ্রহণকারী দেশগুলি। বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং পর্যটন দেশগুলিকে উন্নীত করার জন্য একটি বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যা আমরা দেখেছি দক্ষিণ আফ্রিকায় চীনের ফিফা বিশ্বকাপে অলিম্পিক গেমসে। 

তারা তাদের দেশ এবং তাদের সংস্কৃতিকে এমনভাবে তুলে ধরেছে যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসা পেয়েছে। ক্রিকেট বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য ক্রীড়া ইভেন্ট হতে পারে। আমরা ইতিমধ্যে আইসিসি বিশ্বকাপ এবং টি-টোয়েন্টি ইভেন্ট সফলভাবে সাজিয়েছি। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা আমাদের দেশকে একটি চমৎকার পর্যটন গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছি। বাংলাদশে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার এবং বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ।

সদ্য শেষ হওয়া  বিশ্ব টি টোয়েন্টি বিশকাপ সহ আরো কয়েকটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এর সাক্ষী থাকায় শারজাহকে এখন বিশ্বব্যাপী ক্রিকেটপ্রেমীরা এক নামেই চেনেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি রাজ্য ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মজার ব্যাপার হলো ক্রিকেট তাদের দেশে জনপ্রিয় খেলা নয়। শুধু অনুষ্ঠানগুলো সাজিয়ে তারা ক্রিকেটপ্রেমী দেশগুলোর দর্শকদের শারজাহ সফরে আকৃষ্ট করেছে।

ইভেন্টগুলি তাদের পর্যটন খাত থেকে প্রচুর আয় করতে দেয়। এখন আমাদের এই দৃষ্টিকোণ বিষয়ের উপর ফোকাস করতে হবে, যাতে ক্রীড়া ইভেন্টগুলিকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে পারি। অন্যথায় এসব আয়োজন জনগণের অর্থের অপচয় এবং ক্রীড়া ইভেন্ট সংলগ্ন দেশের একটি ছোট অঞ্চলে কয়েক দিনের উত্তেজনা ও সৌন্দর্যবর্ধনের বাহক হিসেবে পরিণত করবে যেখান বিশ্বের দরবারে তুলে ধরাই মূল উদ্দেশ্য।

 

লিখেছেন : মোঃ ইকবাল হোসেন, প্রভাষক, ট্যূরিজম এন্ড হসপিটালিটি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্সটিটিউট অব আইটি

সর্বশেষ