ন্যায়বিচারের জন্য ফেসবুকে ধরনা পুলিশের

জাস্টিস ফর মহুয়া। জাস্টিস ফর ফাদার।’ ফেসবুকে এমন হ্যাশট্যাগ দিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা। রাজধানীর বনানীতে ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট মহুয়া হাজংয়ের বাবা গাড়িচাপায় পা হারানোর ঘটনায় ‘ন্যায়বিচার’ চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারে নেমেছে পুলিশ। সঙ্গে দেখা যাচ্ছে মহুয়া হাজং ও তাঁর বাবার একটি ছবি।

গত ২ ডিসেম্বর রাজধানীর বনানীতে এক বিচারপতির ছেলে গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দেন মোটরসাইকেলে থাকা পুলিশ সার্জেন্ট মহুয়ার বাবা মনোরঞ্জন হাজংকে। তাতে মনোরঞ্জনের এক পা কেটে ফেলতে হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই মামলা নিচ্ছিল না পুলিশ। গণমাধ্যমে আলোচনা ছড়ালে ঘটনার ১৪ দিন পর ভুক্তভোগী মহুয়ার মামলা গ্রহণ করে পুলিশ। তবে এর আগেই অভিযুক্ত গাড়িচালক বিচারপতির ছেলের করা জিডি গ্রহণ করে বনানী থানা পুলিশ। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তারপর হ্যাশট্যাগ প্রচারণা নিয়ে মাঠে নামে পুলিশ।

এদিকে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবিতে গতকাল রবিবার বিকেলে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছেন লেখক, শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁরা বলেছেন, ন্যায়বিচার পাওয়ার বাধা সবখানেই আছে। যাঁরা কম ক্ষমতাধর তাঁরা বেশি ক্ষমতাধরদের প্রভাবে বিচার পান না। এ কারণেই পুলিশের সাধারণ সদস্যরা বিচার চাইছেন। এ ঘটনায় আসামির প্রভাবের সঙ্গে পুলিশেরও দায় রয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

ফেসবুকে হ্যাশট্যাগ দেওয়া পোস্টের মধ্যে মহুয়া ও তাঁর বাবার একটি ছবি দিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন পান্না আক্তার নামের ডিএমপির আরেক নারী সার্জেন্ট। পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘স্টে উইথ মহুয়া। আমি ও আমরা ন্যায়বিচারপ্রত্যাশী।’ এই স্ট্যাটাসে সিদ্দিক নামের একজন পুলিশ সদস্য লিখেছেন, ‘এর বিচার চাই। তাঁকে আইনের আওতায় আনতে হবে।’

সনেট শিকদার নামের এক সার্জেন্ট হ্যাশট্যাগ দিয়ে তাঁর স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার শক্তিটুকু আগেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে ইনশাআল্লাহ। আমি আমার অবস্থানটা পরিষ্কার করলাম।’ ১৫ ডিসেম্বর দেওয়া তাঁর স্ট্যাটাসটি অনেকেই শেয়ার করেছেন। মন্তব্য করেছেন অনেকে। জুয়েল মাহমুদ নামের এক কনস্টেবল মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা নিজেরাই নিজেদের কাছে খুব অসহায়।’

পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও এমন অনেক পোস্ট দেখা গেছে ফেসবুকে। তবে পুলিশ সদস্যদের পোস্টই বেশি শেয়ার হচ্ছে।

জানতে চাইলে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন  বলেন, ‘পুলিশের যাঁরা ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন, হ্যাশট্যাগ দিচ্ছেন তাঁরা কেউ নীতিনির্ধারক না। পুলিশ সদস্য হলেও তাঁদের ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা আছে। ন্যায়বিচার পাওয়ার বাধা সবখানেই আছে। সাধারণ মানুষ সবখানে বিচার পায় না। বিষয়টি এমন যে যার যতটুকু ক্ষমতা আছে, সে ততখানি বিচার পায়।’

ঘটনার দায়দায়িত্ব কার বলে মনে করেন—এমন প্রশ্নে নূর খান লিটন বলেন, ‘এ ঘটনায় পুলিশেরই বেশি দায়। তারা মামলা নিতে সময়ক্ষেপণ করেছে। পুলিশ গাড়িটি ছেড়ে দিয়েছে। এই দেরি হওয়াতে বিচারপতিও বিতর্কিত হয়েছেন। এমনটি আসলে কেন হলো, তা দেখা দরকার। বিচারপতির ব্যাপারটি যখন এসেছে তখন সুয়োমোটো ইস্যু করে বিষয়টি পরিষ্কার করতে পারতেন।’

এদিকে গতকাল বিকেলে ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ’ ব্যানারে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘বিচারপতি সমাজের একজন ওপরতলার বাসিন্দা। হাজংরা তলানিতে থাকেন বলে তাঁরা বিচার পান না। এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাঠামোর একটি বৈষম্য।’

তদন্ত করে ব্যবস্থা : গতকাল দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) কে এম হাফিজ আক্তার সার্জেন্ট মহুয়ার মামলার ব্যাপারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।  সার্জেন্ট মহুয়ার করা মামলা থেকে আসামির নাম বাদ দিয়ে আজ্ঞাতপরিচয় আসামি করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সার্জেন্ট মহুয়া হাজংয়ের বিষয়টি আমি জানি। এ ঘটনায় আমাদের গুলশান বিভাগের বনানী থানায় একটি মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে। মামলায় নাম না দেওয়ার বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্র: কালেরকন্ঠ

সর্বশেষ