চলতি বছরে রাজধানীতে ১১৪ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১১৯ জন নিহত : রোড সেফটি ফাউন্ডেশন

0
52

চলতি বছরে রাজধানীতে ১১৪ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১১৯ জন নিহত : রোড সেফটি ফাউন্ডেশন

 

ঢাকা ২৮ নভেম্বর ২০২১ :

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে ১১৪ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১১৯ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে পথচারী ৬২ জন (৫২.১০%) মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ৩৩ জন (২৭.৭৩%) এবং অন্যান্য যানবাহন (বাস, রেকার, প্যাডেল রিকশা, প্যাডেল ভ্যান, অটোভ্যান, ঠ্যালাগাড়ি ইত্যাদি)-এর  যাত্রী ও আরোহী  ২৪ জন (২০.১৬%)।

সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ২৩টি (২০.১৭%), সকালে ২১টি (১৮.৪২%), দুপুরে ১১টি (৯.৬৪%), বিকালে ১৬টি (১৪.০৩%), সন্ধ্যায় ৪টি (৩.৫০%) এবং রাতে ৩৯টি (৩৪.২১%)।

এসব দুর্ঘটনায় ১৭২টি যানবাহন সম্পৃক্ত। ট্রাক-৩৭টি, বাস-৪২টি, মোটরসাইকেল-৩৩টি, কাভার্ডভ্যান-৪টি, পিকআপ-১৫টি, সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী ট্রাক ৪টি, অটোরিকশা-৮টি, লরি-২টি, লেগুনা-৪টি, জীপ-২টি, রিকশা-৬টি, ট্রেন-১টি, রেকার-২টি, প্রাইভেটকার-৭টি, ঠেলাগাড়ি-১টি এবং অটোভ্যান-৪টি।

দুর্ঘটনার কারণসমূহ:

১. অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অপ্রতুল সড়ক;

২. একই সড়কে অযান্ত্রিক-যান্ত্রিক, স্বল্প ও দ্রুতগতির যানবাহনের চলাচল এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা;

৩.সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব;

৪.যথাস্থানে ফুটওভার ব্রিজ ও আন্ডারপাস না থাকা। থাকলেও সেগুলো ব্যবহার উপযোগী না থাকা এবং ফুটপাত হকারদের দখলে থাকা;

৫. রাজধানীর যাত্রীবাহী বাস টার্গেটভিত্তিক চালানোর ফলে চালক-শ্রমিকরা পথে পথে যাত্রী উঠানোর জন্য বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় অবতীর্ন হয়। এতে প্রায়শ: দুর্ঘটনা ঘটে;

৬. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল-সহ নির্দিষ্ট স্থানে বাস-বে ও বাস স্টপেজ না থাকা;

৭. ঢাকা শহরের পাশ দিয়ে বাইপাস না থাকার ফলে রাত ১০টা থেকে সকাল পর্যন্ত পণ্যবাহী যানবাহন রাজধানীর ভেতরে বেপরোয়াভাবে চলাচল করে। এই সময়টিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে;

৮. রাজধানীতে অধিক পরিমানে মোটরসাইকেলের চলাচল;

৯. দীর্ঘসময় যানজটে আটকে থাকার পর ট্রাফিক সিগনাল ছাড়লে সবধরনের যানবাহন একযোগে বেপরোয়া গতিতে ছোটা;

১০. অসহনীয় যানজটের কারণে সড়ক ব্যবহারকারীদের আচরণে অসহিষ্ণুতা ও অস্থিরতা তৈরি হওয়া;

১১. গণপরিবহন মানসম্মত ও সহজলভ্য না হওয়ার কারণে রিকশার ব্যবহার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দ্রুতগতির যানবাহন চলাচলকারী সড়কে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ

১২. ফ্লাইওভারগুলোতে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকা।

সুপারিশসমূহ:

১. প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ঢাকার জনসংখ্যা কমাতে হবে;

২. ঢাকার খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শাখা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে খুলতে হবে;

৩. জেলা ও বিভাগী পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে কর্মজীবী মানুষের ঢাকামুখী স্রোত থামাতে হবে;

৪. সামর্থ বিবেচনা করে রাজধানীতে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য পৃথক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করে ব্যক্তিগত গাড়ি নিরুৎসাহিত করতে হবে;

৫. প্রধান সড়কগুলোতে গণপরিবহনের জন্য আলাদা লেন তৈরি করতে হবে। এই লেনে কোনো প্রকার ব্যক্তিগত যানবাহন চলতে পারবে না;

৬. ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে;

৭. গণপরিবহনে খাতের চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে;

৮. “সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮” সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে;

গণপরিবহনের নৈরাজ্য এবং যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকা বর্তমানে বসবাস অনুপোযোগী শহরের তালিকায়। এখানে পিকআওয়ারে যানবাহনের গড় গতিবেগ ৫ কিলোমিটার। গবেষণা বলছে, রাজধানীতে যানজটে প্রতিদিন ৫০ লক্ষ কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে, যার বাৎসরিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

রাজধানীর সড়কের ৭০ শতাংশ দখল করে চলে ব্যক্তিগত গাড়ি ও রিকশা। ৩০ শতাংশেরও কম জায়গায় চলে গণপরিবহন। অথচ ব্যক্তিগত গাড়ি মাত্র ১১ শতাংশ যাত্রী বহন করে, আর গণপরিবহন বহন করে ৪৯ শতাংশ যাত্রী।

এই বৈষম্যমূলক অবস্থার প্রধান কারণ হলো, রাজধানীর গণপরিবহন বিষয়ে যারা পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তাঁরা এবং তাঁদের পরিবার গণপরিবহন ব্যবহার করেন না। ফলে জনভোগান্তির যন্ত্রণা তারা বোধ করেন না। তারা দুর্ঘটনায়ও আক্রান্ত হন না। এটি বুর্জোয়া এবং আমলাতান্ত্রিক আচরণগত সমস্যা। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে রাজধানীতে একটি নিরাপদ, জনবান্ধব ও টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা অতীব জরুরি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here