বিআইপি আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের উদ্বোধন

0
40

বিআইপি আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের উদ্বোধন

 

ঢাকা অক্টোবর ৩০ ২০২১ :

 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বি.আই.পি.) এর উদ্যোগে ‘মহামারী পরবর্তী কালে অন্তর্ভূক্তিতা ও স্থায়িত্বশীলতার জন্য পরিকল্পনা’ প্রতিপাদ্যে বিআইপি আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে।

আজ সকাল ৩০ অক্টোবর ২০২১, ১০.৩০ ঘটিকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি)  এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং মূল প্ল্যানারী সেশন অনুষ্ঠিত হয় যা চলবে আগামী ০৬ নভেম্বর, ২০২১ পর্যন্ত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রথম সেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব মোঃ তাজুল ইসলাম, এমপি এবং সাম্মানিক অতিথি হিসেবে ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র জনাব মোঃ আতিকুল ইসলাম ।

উক্ত অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব মোঃ তাজুল ইসলাম বলেন, ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশকে পরিকল্পিত উপায়ে গড়ে তুলতে  আমাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা উচিত। সার্বজনীন জনস্বার্থ রক্ষা করতে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের উর্ধ্বে গিয়ে পরিকল্পনার আদর্শ অনুযায়ী নগর গুলো গড়ে তুলতে হবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন পরিকল্পনাবিদগণ। নগর এলাকায় যে কোন ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ করবার আগে নাগরিক সুবিধাদী বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা দরকার। ঢাকার খালগুলো সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে গত বর্ষায় জলাবদ্ধতা সফলতার সাথে মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র জনাব মোঃ আতিকুল ইসলাম বলেন, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা কমেছে বহুলাংশে , কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে এটি পরিকল্পিত নগর হতো। নগরের সকল অবৈধ দখলদারদের সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, কোন দখলদারদের সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ছাড় দেয়া হবে না। এসময় তিনি উদাহরণ দিতে গিয়ে উল্লেখ করেন রাজধানীর কল্যানপুরের কথা, যেখানে ১৪ লক্ষ মানুষের জন্য প্ল্যান করা ১৭৩ একরের ওয়াটার রিটেনশন পন্ড, যার ১৭০ একর দখল হয়ে মাত্র ৩ একর বেচে আছে। বর্তমানে এগুলো উদ্ধার করা শুরু হয়েছে এবং এর মাধ্যমেই আমরা নগরবাসীকে একটি নতুন শহর উপহার দিতে চাই। বনশ্রী, মোহাম্মদপুর এলাকার বেসরকারী আবাসন প্রকল্পের খেলার মাঠের জন্য বরাদ্দকৃত প্লট বিক্রি করে দেয়ার জন্য আবাসন কোম্পানীর মালিকদের অভিযুক্ত করেন তিনি।

সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ, পার্কসহ নাগরিক সুবিধাদী তৈরি করা হবে। ডিএনসিসি’র নবগঠিত আঠারোটি ওয়ার্ডের সুন্দর ও টেকসই পরিকল্পনা করার জন্য সংশ্লিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে এলাকাসমূহ সকলের জন্য বাসযোগ্য হবে।

জার্মান ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এর প্রধান মি. জোহানেস স্নাইডার বলেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি সময়ে দ্রুত নগরায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১৫ মিলিয়ন কিন্তু বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ মিলিয়ন এবং এটা পূর্বাভাস করা হচ্ছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করবে। যা শহরের পরিকল্পনার জন্য অবশ্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তিনি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে বলেন, নগর পরিকল্পনার প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের জলবায়ু ও পরিবেশ সহনশীলতার দিকে নজর রাখতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জার্মান এজেন্সী ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন(জিআইজেড) বাংলাদেশ এর পরিচালক ড. এঞ্জেলিকা ফ্লেডারম্যান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক আঞ্চলিক ও জাতীয় পরিকল্পনা। এ ব্যপারে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত যে কোন পদক্ষেপে জার্মান এজেন্সী ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন(জিআইজেড) পাশে থাকবে।

এছাড়াও বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ এর সিনিয়র সচিব জনাব হেলাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, বর্তমান সরকারের ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্পের মাধ্যমে পরিকল্পিত উপায়ে নাগরিক সুবিধা পৌছে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ের পরিকল্পনায় পরিকল্পনাবিদদের সম্পৃক্ত না করলে গ্রামীণ এলাকার বিশৃঙ্খল উন্নয়ন নিয়ন্ত্রন করা সম্ভবপর হবে না।

সম্মেলনের কনভেনার ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স এর সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বিশ্বব্যাপী কোভিড মহামারী দূর্যোগের সর্বব্যাপী প্রভাবের ফলে আগামী দিনের নগর, আঞ্চলিক ও গ্রামীণ পরিকল্পনায় টেকসই উন্নয়ন ধারণা ও অন্তর্ভূক্তিমূলক পরিকল্পনার বিষয়টি আরো বেশি প্রাসংগিক হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের নগরায়ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সাম্প্রতিক ধারা বিশ্লেষণেও এই বিষয়গুলো অতীব গুরুত্বের দাবি রাখে। এই বাস্তবতায় ‘আইকার্প ২০২১’ এর বিভিন্ন সেশনে যে প্রবন্ধসমূহ উপস্থাপিত হবে তা সামনের দিনে বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক নগরায়ন ও ভৌত উন্নয়ন পরিকল্পনার গতি প্রকৃতি নির্ধারণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স এর  ড. আকতার মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমূহকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশনসমূহের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নাগরিক সেবা প্রদান করা সহজ হবে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় পরিকল্পনাবিদ নিয়োগের মাধ্যমে দেশের ভৌত উন্নয়নকে সঠিক পথে পরিচালিত করবার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবার আহ্বান জানান তিনি।

পরবর্তীতে বিকাল ০৩.০০ টায় ‘বাংলাদেশের সুষম উন্নয়নের জন্য টেকসই পরিকল্পনা’ শীর্ষক সেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার এর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মোঃ মশিউর রহমান, এনডিসি এবং জার্মান ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এর প্রধান মি. জোহানেস স্নাইডার বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। প্ল্যানারী সেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর প্ল্যানিং কমিশন এর সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ এর প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) মোঃ মফিদুল ইসলাম ও  বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।

প্ল্যানারী সেশনে বিশেষ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আব্দুল বায়েস। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং প্ল্যানারী সেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সম্মানিত সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ।

প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের  পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, আগে আমাদের পরিকল্পনা গুলো উপজেলা পর্যায়ে হতো না , আমরা ন্যাশনাল প্লান অনুসরণ করতাম। কিন্তু বর্তমানে আমরা চেষ্টা করছি উপজেলাগুলোকে পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসতে, কেন না যে কোন পরিকল্পনাতেই স্থানীয় নাগরিক চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এ লক্ষ্যে আমরা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করছি। তাদের মাধ্যমে আমরা জনগণের চাহিদা ও আকাঙ্খা সমন্বয় করে সেটা ন্যাশনাল প্লানে প্রতিস্থাপন করছি। এ ক্ষেত্রে গবেষক , দক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদ ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের মতামত কেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এভাবে আমরা দেশের সকল পর্যায়ের পরিকল্পনায় সকলের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করছি।

আন্তর্জাতিক এই কনফারেন্স এর সার্বিক সহযোগি হিসেবে আছে জার্মান এজেন্সী ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন ও জিআইজেড বাংলাদেশ। এছাড়া সহযোগিতায় থাকছে বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থা, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)  ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন  রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ঢাকা ওয়াসা), জাতীয় গৃহায়ণ অধিদপ্তর, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউএনহ্যাবিটেট,  খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), মিউনিসিপাল এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ম্যাব), নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক এই কনফারেন্স এর বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে আছে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অফ সিটি এন্ড রিজিওনাল প্ল্যানার্স (আইসোকার্প)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here