Spread the love

নরসিংদীর মনোহরদীতে সমবায় সমিতির নামে এক জামাত নেতার হায় হায় কোম্পানি’ গ্রাহক আমানতের ২০ কোটি টাকা গায়েব করে দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জামাতের স্থানীয় এক নেতা এ হায় হায় কোম্পানির সংগঠক। টাকার জন্য আমানতকারীরা প্রতিদিনই সমিতির অফিসে ভিড় জমিয়ে বিক্ষোভ করছেন।

মনোহরদী উপজেলার খিদিরপুর বাজারে ১০/১২ বছর আগে ‘শাহ সুলতান ঋণদান ও সমবায় সমিতি’ নামে একটি অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠান আত্মপ্রকাশ করে। জামায়াত ইসলামের একজন রোকন আবুল কালাম আজাদ ছিলেন এর সংগঠক। সমিতিটি পুঁজি সংগ্রহের জন্য ব্যাংক সুদের প্রায় দ্বিগুণ মুনাফার লোভ দেখিয়ে এলাকার সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে। এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন জামাত ঘরানার আরো তিন মাদ্রাসা শিক্ষক। তাদের প্ররোচণায় স্থানীয় অসচেতন জনগোষ্ঠী এতে বিপুল পরিমাণে টাকা বিনিয়োগ করে।

তথ্যানুসন্ধানে এরকম কয়েকজন কমিশনভিত্তিক এজেন্টের নাম জানা গেছে। তাদের মধ্যে পশ্চিম চরমান্দালীয়া গ্রামের ওসমান মৌলভী, মনতলা গ্রামের সাহিদ মৌলভী ও খিদিরপুরের মফিজ মৌলভী অন্যতম। সমিতির সংগঠক ও পরিচালক হিসেবে রয়েছেন জামায়াত নেতা আবুল কালাম আজাদ। স্থানীয়ভাবে কালাম মৌলভী বা কালাম হুজুর নামে পরিচিত তিনি।

জামায়াত নেতা কালাম মৌলভীসহ সমিতির পুঁজি সংগ্রহের এজেন্ট ওসমান ও সাহিদ মৌলভী মনতলা ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষক। অপরজন মফিজ মৌলভী উপজেলার সাগরদী এলাকার একটি মাদ্রাসায় কর্মরত। কমিশনভিত্তিক এসব এজেন্টের নাম পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের সাথে আলাপ করে পাওয়া গেছে। কালাম মৌলভীও এ প্রতিবেদকের কাছে তাদের সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করেছেন।

তারা লাখে মাসিক ১৪শ’ টাকা মুনাফার লোভ দেখিয়ে শাহ সুলতান সমিতিতে টাকা বিনিয়োগ করতে গ্রামে গ্রামে বাড়ি বাড়ি ধর্না দিয়ে বেড়িয়েছেন। আর এভাবে নিজেদের লোভের বলি করেছেন এলাকার আমানতকারীদের। এলাকায় কালাম মৌলভীর সামাজিকভাবে বিশ্বস্ত একটি ভাবমূর্তি রয়েছে। এ বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে ধোঁকায় ফেলা হয় বিনিয়োগকারীদের। এর বিনিময়ে কমিশন বাবদ লাখে মোটা একটি অংক কমিশনভিত্তিক এজেন্টরাও হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে মুজিবুর রহমান সাহিদ মৌলভীর সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, তার মাধ্যমে সমিতিতে টাকা জমা হলেও লাভবান নন তিনি। বরং তার নিজেরই সাড়ে ১৪ লাখ টাকা, তার মাধ্যমে ভাগ্নে মনতলার আশরাফ আলীর ২ লাখ ৫০ হাজার এবং শ্যালিকা কিশোরগঞ্জ শহরের আল আমিনের স্ত্রী রোকেয়ার ৩০ লাখ টাকা সমিতিতে জমা আছে বলে জানান তিনি। আর এভাবেই একটি সঞ্চয় ঋণদান ও সমবায় সমিতির নামে প্রায় ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয় বলে অভিযোগে প্রকাশ পেয়েছে।

সমিতির ডিরেকটর পদবীধারী কালাম মৌলভী ও তার পুত্র জুবায়ের এ প্রতিবেদকের সাথে মুখোমুখি আলাপকালে এ অংকটি ১১ কোটি টাকার মতো হবে বলে স্বীকার করেছেন।

তবে অভিযুক্ত কালাম মৌলভী মসজিদে বসে মসজিদের নামে শপথ করে দাবি করেন, এ টাকার কোনো অংকই তার পকেটে যায়নি। সব টাকাই দফায় দফায় নরসিংদীস্থ প্রধান অফিসে জমা হয়েছে। এ সংক্রান্ত কোনো প্রমাণ আছে কিনা জানতে চাইলে আছে বলে জানান পিতা-পুত্র। তবে তা দেখাতে অসমর্থ হন তারা। এ টাকার মধ্যে ৬৯ লাখ টাকা এলাকায় ঋণ হিসেবেও বিভিন্ন জনের কাছে রয়েছে বলেও দাবি করা হত।

কালাম মৌলভী জানান, এ অফিসসহ প্রধান অফিসের সব টাকাই বিনিয়োগ হয়েছে নরসিংদীতে শাহ সুলতান নামের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে। এ জন্য ১০ কোটি টাকার একটি ব্যাংক লোনও করতে হয়েছে তাদের। প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত লোকসান দিয়ে দিয়ে এখন সেসব পুরোপুরি বন্ধ- বলে দাবি কালাম মৌলভীর।

তিনি আরও জানান, এ পরিস্থিতিতে শাহ সুলতানের নরসিংদীস্থ প্রধান অফিসসহ খিদিরপুরস্থ অফিসের বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য টাকা ফেরত দেয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। বিনিয়োগকারীদের কোনো টাকাই এ মুহূর্তে ফেরত দেয়ার উপায়ই তার নেই। তবে তিনি আপ্রাণ চেষ্টায় আছেন প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রি করে পর্যায়ক্রমে সবার জমাকৃত টাকা ফিরিয়ে দিতে পারবেন। বর্তমান জটিল পরিস্থিতিতে সমিতির এমডি ফারুক মোল্লা গা-ঢাকা দিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল করে দিয়েছে বলেও দাবি তার। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা তাকে টাকার জন্য এখন প্রচণ্ড চাপ দিচ্ছেন তাকে। তদুপরি প্রতিষ্ঠানটির ১৯ পরিচালকের একজন হিসেবে ১০ কোটি টাকার ব্যাংক ঋনের দায়ও আছে তার ওপর। এমতাবস্থায় তিনি চরম বিপর্যস্ত বলে জানান করেন কালাম মৌলভী।

তবে না পালিয়ে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বেচে জমাকৃত টাকা ফেরত দেবেন বলে জানালেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে আবুল কালাম আজাদ জামায়াত রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করে জানান, কিছুদিন আগে দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার অপরাপর পরিচালকদের সম্পর্কে জানতে চাইলে তারাও জামায়াত সমর্থক বলে স্বীকার করেন তিনি।

তথ্যানুসন্ধানকালে এলাকাবাসীর অনেকেই খোলাখুলিভাবে তাদের সর্বস্বান্ত হবার বর্ণনা দিয়েছেন এ প্রতিবেদককে। তাদের মধ্যে পশ্চিম চরমান্দালীয়া গ্রামের রিয়াজ উদ্দীনের ছেলে ওবাইদুল (২৫) জানান, ওসমান মৌলভীর সক্রিয় প্ররোচনায় সোনালী ব্যাংক রামপুর শাখায় জমাকৃত টাকা থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা তুলে সমিতিতে জমা রাখেন তিনি। বিপরীতে একটি কাঁচা রশিদ ও টাকা উত্তোলনের জন্য ব্যাংকের আদলে একটি চেকবই দেয়া হয় তাকে। আর তা ‘শাহ সুলতান এমসিএস’ নামে অজ্ঞাত একটি প্রতিষ্ঠানের নামে। অথচ সমিতির অফিস হিসেবে যে অফিসে টাকা দেন তিনি তার সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা রয়েছে ‘শাহ সুলতান সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি’র নাম। তাহলে শাহ সুলতান এমসিএস’র সাথে এ সমিতির নিকট অথবা দূর আত্মীয়তার কিরকম সম্পর্ক তা বোধগম্য নয়। নাকি প্রতারণার এও এক কৌশল কে বলবে- এমন প্রশ্ন তার।

ওবাইদুল আরও জানান, টাকা ফেরত পেতে সমিতি এবং ওসমান মৌলভীর বাড়িতে ধর্না দিয়ে হয়রান হচ্ছেন তিনি। কিন্তু জমাকৃত টাকা আর মিলছে না। ওসমান মৌলভীও এখন আত্মগোপনে।

ওবায়দুলের কথার সত্যতা মেলে ওসমান মৌলভীর পশ্চিম চরমান্দালীয়ার বাড়ি গিয়ে। তার তথ্য পাওয়া যায়নি সেখানে, ফোন নম্বরটিও নয়। ওবাইদুলদের প্রতিবেশী নাছিমার (২২) কাহিনীও প্রায় অভিন্ন। স্বপনের স্ত্রী নাছিমার জমাকৃত টাকার পরিমান ২ লাখ। আরেক প্রতিবেশী রুমার ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। টাকার শোকে তারা এখন কপাল চাপড়াচ্ছেন।

মনতলা নতুন বাজারের চা দোকানি সজীব (২৫) জানান, তার শ্বাশুড়ি কমলা থাকেন ঢাকায়। ওসমান মৌলভী তার পেছনে লেগে থেকে তার ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা সমিতিতে বিনিয়োগে দেন। সেই টাকা ফেরতের আর নামগন্ধও নেই।

নয়াপাড়া গ্রামের হামিদা শাহ সুলতান ২ লাখ টাকা জমা রেখে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি নিঃসন্তান হিসেবে তার ওয়ারিশরা সমিতিতে টাকার জন্য গেলে টাকা মসজিদে দান করে দেয়া হবে বলে কালাম মৌলভী জানান তাদের। মৃত হামিদার বোনের মেয়ে মাজেদা (২২) এসব তথ্য দিতে গিয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, সেই টাকা আদৌ কোনো মসজিদে গেছে কিনা, গেলে রশিদ কোন মসজিদে- জানতে পারছেন না তারা।

সূত্র-বাংলাদেশ জার্নাল