Spread the love

 

দেখতে দেখতে ২০২১ সালের চতুর্থ মাস এসে গেল। সামনে বাঙালির নববর্ষ অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ। সম্ভবত একই দিনে পবিত্র রমজানও শুরু হবে। কয়েকদিনের রাজনৈতিক খবর বাদে সব কাগজেই গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হচ্ছে দ্রব্যমূল্যের খবর। পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে একশ্রেণির ব্যবসায়ী প্রায় সব ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে। এই কীর্তি দেখে আমার পাকিস্তান আমলের (১৯৪৭-৭১) কথা মনে পড়ে গেল। তখন বিশেষ করে স্বাধীনতার পূর্ববর্তীকালে মূল্যবৃদ্ধি ঘটলেই আমরা মিছিল নিয়ে বেরোতাম। স্লোগান একটা: ‘দ্রব্যমূল্য কমাতে হবে, নইলে গদি ছাড়তে হবে।’ সেই আমলে বাজেট হলেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটত।

এটি ছিল একটি নিয়মিত ঘটনা। আর প্রতিবাদ মিছিল, এমনকি হরতালও ছিল নিয়মিত ঘটনা। আমরা মনে করতাম, দ্রব্যমূল্য বাড়ানোটা অন্যায় এবং ব্যবসায়ীদের কারসাজি। দেখতে দেখতে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা এলো। স্বাধীনতার পর আবার বিশ্বে তেলের মূল্য মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে সব দ্রব্যমূল্যের ওপর। সেটি ১৯৭২-৭৩ সালের দিকের ঘটনা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং দৈনিক সংবাদের অর্থনীতির পাতার সম্পাদক। বলা বাহুল্য, আর কোনো কাগজে এ ধরনের পাতা ছিল না। একবার দ্রব্যমূল্যের ওপর একটি স্টোরি করি। শিরোনাম দিই ‘বাজারে আগুন’। এই সংবাদ পাঠ করে বিখ্যাত সাংবাদিক প্রয়াত জহুর হোসেন চৌধুরী আমাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলেন, মিঞা আগুন তো লাগালেন, জিনিসের দাম আরও বাড়ালে শিরোনাম কী করবেন? আমি লা জওয়াব।

তখন এ কথার তাৎপর্য বুঝিনি। প্রায় পাঁচ দশক যাওয়ার পর আজ বুঝতে পারছি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ছাড়া কমার কোনো কারণ নেই। আমার বোঝার কাজটি আরও শক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক একটি অনভিপ্রেত হরতাল থেকে। এ হরতাল কোনো অর্থনৈতিক দাবির ওপর নয়। নয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে। কোনো রাজনৈতিক দলও এখন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আর আগের মতো মিছিল-মিটিং করে না, হরতাল তো দূরের কথা। তার মানে কী? সবাই কি আমার মতো ধরে নিয়েছেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবেই? এর থেকে রেহাই নেই? প্রত্যেক বাজেটের সময়, পবিত্র রমজান ও কোরবানির ঈদের সময়, শীতকালে পিকনিকের সময়, বন্যা ও খরার সময়, সরবরাহ ঘাটতি ও উৎপাদন ঘাটতির সময়, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সময়সহ নানা সময়ে নানা অজুহাতে ব্যবসায়ী ভাইয়েরা মূল্যবৃদ্ধি ঘটাবেন। নিয়মিতভাবে তা করবেন তারা। দেখা যাচ্ছে, তারা সরকারের কথাও রাখেন না। পবিত্র ধর্মীয় উৎসবে সাধারণ মুসল্লিদের কথাও চিন্তা করেন না। যদি করতেন তাহলে আর দুদিন বাদেই যখন পবিত্র রমজান মাস, তখন তারা সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে একটু স্বস্তি দিতেন। না, তা হওয়ার নয়। বাজারে সব ভোগ্যপণ্যের মূল্য ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। চাল, গম, আটাও বাদ নেই। সরকারের গুদামে ১৩-১৪ লাখ টনের স্থলে ৪-৫ লাখ টন চাল আছে-এ খবরের সুবাদে চালের মূল্য ব্যবসায়ীরা বাড়াচ্ছেন আজ দু-তিন মাস ধরে। চিনি, সয়াবিন তেল, ময়দা, ছোলা, খেজুর, মসলাপাতি, মুরগিসহ এমন কোনো দ্রব্য নেই, যার মূল্য বাড়েনি, বাড়ছে না। অথচ কেউ এখন আর প্রতিবাদ করছে না। মনে হয় সবাই ধরে নিয়েছেন এটাই নিয়তি, এর থেকে রেহাই নেই।

স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ের দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে এখনকার দ্রব্যমূল্যের তুলনা করলে বোঝা যাবে ঘটনাটা কী ঘটছে। চাল বাদে সব জিনিসের দাম ২০০-৩০০-৪০০ গুণ, এমনকি আরও বেশি বেড়েছে। একটি কাগজে দেখলাম, ১৯৭২-৭৩ সালের তুলনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৩০১ গুণের মতো। এটি হয়তো ঠিক। এবং তা-ও গড়ের হিসাবে। এখানে বড়লোকের হিসাব যেমন আছে, তেমনি আছে বেকার ও নিম্নবিত্তের হিসাবও। এরপরও যদি তা ধরে আলোচনা করি, তাহলে কী দাঁড়াল? আয় যেভাবে বেড়েছে, দ্রব্যমূল্য কি তার তুলনায় বেশি হারে বাড়েনি? অবশ্যই তাই হচ্ছে চিত্র। এখানে প্রশ্নটা হচ্ছে: দ্রব্যমূল্য যখন বাড়বেই, তা যখন কমার কোনো কারণ নেই, তাহলে সেই অনুপাতে আয় বাড়ানো হোক, বেতনভাতা বাড়ানো হোক। অথবা আরেকটি বিকল্প হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সহনীয় মূল্যে মানুষকে সরবরাহ করা হোক। অন্তত গরিব, মধ্যবিত্ত, বেওয়া-বিধবা, বেকার লোকজনদের মধ্যে যাতে তারা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে। যেমন, প্রতিবেশী ভারতের কথা বলা যায়। সেখানে দুই ধরনের রেশন কার্ড আছে বলে শুনেছি। দারিদ্র্যসীমার ওপরে যারা তাদের এক ধরনের কার্ড এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে যারা তারা সারা বছর ১-২ রুপিতে এক কেজি গম/চাল পায় বলে কাগজে দেখেছি। আমাদের এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই। আমাদের জরুরি ভিত্তিতে চাল-গম দেওয়ার একটা ব্যবস্থা আছে, তা-ও সারা বছর নয়। আর মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সেখানে যোগ্যপ্রার্থী নয়। এ ছাড়া সরকার জরুরিকালে খোলাবাজারি নীতিতে জিনিসপত্র সরবরাহ করে একটা নির্দিষ্ট মূল্যে। এটিও সারা বছরের জন্য নয় এবং নিখিল বাংলাদেশের জন্য নয়। এ অবস্থায় বাকি থাকে আয়বৃদ্ধির পথ।

এ মুহূর্তের খবর, করোনাকালীন গত এক বছরে লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার ও কর্মহীন হয়েছে। কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। অগণিত মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। শহরের দারিদ্র্য গ্রামের চেয়ে বেশি বেড়েছে। মানুষের হাতে ‘ক্যাশ’ নেই, কাজ নেই। এখন নতুন করে করোনা-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। বর্তমানের করোনা এক বছর আগের চেয়ে ভয়াবহ। প্রচুর লোক মারা যাচ্ছে। হাসপাতালে কোনো জায়গা নেই, রোগীদের অক্সিজেন নেই; যা-ও অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল তাতেও ছেদ পড়েছে। সামনে বাজেট। আর মাত্র দুই মাস বাকি। জুন মাসে বাজেট দেওয়া হবে। অর্থনীতির ‘পারফরমেন্স’ কী হবে, তা এখনই সঠিক বলা যাচ্ছে না। করোনার নতুন আঘাত অর্থনীতি কতটুকু সহ্য করতে পারবে তা অনিশ্চিত। রপ্তানি, আমদানি, রেমিটেন্স ও রাজস্ব ইত্যাদি স্বাভাবিক হয়ে আসছিল; কিন্তু এসবেও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। এর অর্থ রোজগারের বাজার আবারও অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা। আমার জানা এক কাঠমিস্ত্রি ডিসেম্বর-জানুয়ারির দিকে ভালোই কাজ পাচ্ছিল। কিন্তু করোনার নতুন আক্রমণের কারণে সে আবার বেকার হয়েছে। হাতে কোনো কাজ নেই। রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিও কাটছাঁট হয়েছে। অথচ এর আকার ঠিক থাকলে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হয়।

সরকার নতুন করে ১৮ দফা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে গত বুধবার। এতে জনজীবন বেশকিছুটা শৃঙ্খলাবদ্ধ হবে। মাস্ক পরতে হবে। ট্রেন অর্ধেক ক্যাপাসিটিতে চলবে, বাসও তাই, কিন্তু বাসের ভাড়া ৬০ শতাংশ বেশি। জরুরি সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব সরকারি-বেসরকারি অফিস/প্রতিষ্ঠান/শিল্পকারখানা ৫০ ভাগ জনবল দ্বারা পরিচালনা করতে হবে। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোয় ধারণক্ষমতার ৫০ ভাগের বেশি মানুষের প্রবেশ বন্ধ করতে হব। সভা-সেমিনার-প্রশিক্ষণ অনলাইনে করতে হবে। পর্যটন, বিনোদন কেন্দ্র/সিনেমা হল/থিয়েটার হলে জনসমাগম সীমিত করতে হবে। উচ্চ সংক্রমণযুক্ত এলাকায় সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিয়ে/জন্মদিনের উৎসবে জনসমাগম নিরুৎসাহিত করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনের ১৮টি দফা পাঠ করলে বোঝা যায়, মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য এসব জরুরি পদক্ষেপ। এ ছাড়া উপায় নেই।

প্রয়োজনবোধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতে পারে, যদি পরিস্থিতি বাধ্য করে। এর অর্থ কী? এর অর্থ হচ্ছে, এসব পদক্ষেপের কারণে কাজের পরিমাণ হ্রাস পাবে, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সংকুচিত হবে, মানুষের চলাচল হ্রাস পাবে। করোনা থেকে বাঁচার পথ গ্রহণ করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে মানুষের আয় কমে যাবে। এমনিতেই বাজার মন্দা। তাহলে মানুষের ভাতের ব্যবস্থা কী? আয়ের ব্যবস্থা না-থাকলে ভাতের ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হবে। এ দুয়ের মাঝখানে দেখা যাচ্ছে একশ্রেণির ব্যবসায়ী চুটিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও মর্মান্তিক। সারা বিশ্বে যখন হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন মারা যাচ্ছে, লাখ লাখ লোক করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে, যখন মানুষকে বাঁচানোর জন্য টিকার সরবরাহ প্রতুল, তখন বিশ্বের তাবৎ ধনীর সম্পদ ২০২০ সালে বেড়েছে। একই অবস্থা আমাদেরও। আমাদের ব্যবসায়ীরা কোনো সুযোগ ছাড়ছেন না। তারাও সামান্য অজুহাতে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে যাচ্ছেন। সমস্যাটা তো এখানেই, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে অথচ মানুষের আয় নেই, আয় সেভাবে বাড়ছে না, অন্যদিকে ধনীদের-ব্যবসায়ীদের আয় স্ফীতি হচ্ছে। এ অবস্থায় সবার সামনেই প্রশ্ন: জীবন ও জীবিকার। জীবন বাঁচাতে রোগ থেকে যেমন রক্ষা পেতে হবে, তেমনি দরকার জীবিকা/আয় তথা ইনকাম। এর ব্যবস্থা কী? দৃশ্যত কোনো বিকল্প দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যে যদি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিটা ঠেকানো যেত, তাহলেও কিছটা রক্ষা পাওয়া যেত। না, তা হওয়ার নয়। গত সপ্তাহেরই একটা খবর ব্যক্তিগত পর্যায়ের। পরিচিত এক বুয়াকে ‘ঘর’ ছাড়তে হয়েছে ঘরভাড়া বৃদ্ধির জন্য। তার আয় কোনোভাবেই বাড়েনি।

শাকসবজি, মাছ-মাংস কোনোটারই দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। আমার বাসা রাস্তার পাশে। মুরগিওয়ালাদের চিৎকারে বাসায় থাকা যেত না। বেশ কিছুদিন ধরে মুরগিওয়ালা নেই, মুরগিও নেই; যা আছে তার দাম অনেক অনেক বেশি। এভাবে প্রতিটি জিনিসের মূল্য বেড়ে চলেছে। অথচ আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা জিনিসপত্রের দাম কমবে না। বিপরীতে দেখা যাচ্ছে, মানুষের আয়ও সমানুপাতে বাড়ছে না। নতুন কর্মসংস্থাও সেভাবে সৃষ্টি হচ্ছে না। যাদের চাকরি আছে তাদের চাকরিও যাচ্ছে। সেদিনই খবর পেলাম একটা বড় গ্রুপের হিসাবরক্ষণ বিভাগে ৬০ জন কর্মচারী-কর্মকর্তা ছিল; ৩৫ জনকেই ছাঁটাই করা হয়েছে। এদিকে ৪০০০ কোটি বিনিয়োগ করে ৩০০-৪০০ লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। তাহলে সার্বিক পরিস্থিতিটা কী দাঁড়াচ্ছে? মানুষ কি তাহলে সরকারের ‘সামাজিক নিরাপত্তা বলায়’ থেকে প্রাপ্ত সাহায্য নিয়েই চলবে? দেখাও যাচ্ছে প্রতিবছর ‘সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের’ অধীন লোকের সংখ্যা বাড়ছে? তাহলে টেকসই উন্নয়নের কী হবে? দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি কি শেষ পর্যন্ত টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে?

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়