সামাজিক পর্যটন ও উন্নয়ন আকাঙ্খা
মোখলেছুর রহমান:
ঢাকা, ২৭ ডিসেম্বর;
আমাদের দেশের উন্নয়ন আকাঙ্খায় অদ্যাবধি, না রাজনীতিবিদগণ না পরিকল্পনাবিদগণ পর্যটনকে স্থান দিয়েছেন। হয়তো সে জন্যই আমাদের জিডিপি-তে পর্যটনের অবদান কত তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামান না।
অথচ যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (WTTC) ২০১৯ সালে বিশ্ব জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ১০.৩%-এর কথা উল্লেখ করে সার্বিক অর্থনৈতিতে এর অবস্থানকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছে। পর্যটন যে আর বিত্তবানদের বিলাস নয় একথা মেনে নিয়েই সময় পাল্টাচ্ছে এবং পাল্টাচ্ছে পর্যটনের রকমফেরও। গবেষকগণ অদ্যাবধি সহস্রাধিক ধরণের পর্যটনের কথা উল্লেখ করে এর বহুমুখি অবয়বের বর্ণনা দিয়েছেন। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের নীতি-নির্ধারকগণ একে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শিল্পের মর্যাদা দিয়ে আপন আঙ্গিনায় তুলে নিয়েছেন আয়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিশেষ ক্ষেত্র হিসেবে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে আধুনিক পর্যটন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলেও সামাজিক পর্যটনের যাত্রা বিংশ শতাব্দীর ৩০-এর দশকে। ইউরোপে এই পর্যটন প্রথম আলোর মুখ দেখে কর্মজীবি মানুষের নৈতিক চাহিদার প্রেক্ষিতে। পরে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) শ্রমিক-কর্মচারিদের জন্য প্রবর্তন করে শ্রান্তি-বিনোদন ছুটি। ফলে কর্মজীবি মানুষের জন্য সুযোগ হয় বিশ্রাম ও বিনোদনের। চল্লিশের দশকে মানবাধিকার ঘোষণা পত্রে এর সারবস্তু বিশেষ গুরুত্বের সাথে স্থান পায়। অতপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বেশ কটি দেশ পর্যটন বিষয়ক সামাজিক নীতিমালা প্রনয়নে মনযোগী হয় এবং দৃষ্টি দেয় সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে দিয়ে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার দিকে।
তখন তারা বুঝতে শুরু করেন যে, সাধারণ মানুষের সানন্দ প্রচেষ্টা ও অংশগ্রহণ ছাড়া অর্থনেতিক সংকট মোকাবেলা করা কঠিন। অনুরূপভাবে গবেষক ও বিজ্ঞানীগণ এ বিষয়ে নানাবিধ গবেষণা শুরু করেন। অতপর গত আট দশক ধরে সামাজিক পর্যটনের উপর নানারূপ পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে উদ্ভাবন করেন এর ব্যাপকতা ও অনুশীলনের নানান ক্ষেত্র।
গবেষকগণ মনে করেন, সামাজিক পর্যটন নানাবিধ কর্মসূচি, আয়োজন ও ক্রিয়াকলাপের সমন্বিত রূপ যা ছাত্র-যুবা, পরিবার, বয়োজেষ্ঠ্য, স্বল্প আয়ের মানুষ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধীদেরকে স্বাগত জনগোষ্ঠীর সাথে অর্থবহ ও মানসম্পন্ন সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে বিনোদন ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করে। জীবনের বাস্তবতার আলোকে সামাজিক পর্যটন একটি অধিকারও বটে যা টেকসই জীবনমান উন্নয়ন ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সম্মান দেখায়। সামাজিক পর্যটনের আন্তর্জাতিক ব্যুরো (Bureau of International Tourism for the Society) বলছে, এই পর্যটন সাংস্কৃতিক বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে সমাজকে সুসংগঠিত করে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সম্পদের সুষম বন্টন ত্বরান্বিত করণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও এর বিকাশ ঘটায়। ১৯৯৬ সালে পর্যটনের মানবীয় ও সামাজিক উদ্দেশ্য সম্বলিত মন্ট্রিল ঘোষণায় বলা হয়, সামাজিক পর্যটনের মূল প্রতিপাদ্য হলো অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর অবদান তুলে ধরা এবং স্থানীয় ও আঞ্চলিক উন্নয়নে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমাজে সুস্পষ্ট প্রভাব সৃষ্টি করা।
সামাজিক পর্যটন বাণিজ্যিক কিংবা অবাণিজ্যিক উভয়ভাবেই পরিচালিত হতে পারে। সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষদেরকে সরকারি কিংবা বেসরকারি যে কোন উদ্যোগে অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত করা এই পর্যটনের আরেকটি লক্ষ্য। কেবল সর্বোচ্চ লাভের উদ্দেশ্য পরিহার করে সামাজিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে সামাজিক গন্তব্যে টেকসই গণপর্যটন পরিচালনা করলে এর প্রকৃত সুফল দৃশ্যমান হবে।
এবার আসা যাক, সামাজিক পর্যটনের পণ্য উপাদানের বিষয়ে। গবেষকগণ বলছেন, সামাজিক, শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক উদ্দেশ্যকে সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যক্তির উন্নয়ন আকাংখাকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি করতে হবে সামাজিক পর্যটনের সেবাপণ্য এবং এর মোড়কীকরণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় স্বত্ত্বা ও পরিবেশের উপর কোনভাবেই ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে সে দিকে সতর্ক নজর রাখতে হবে। ভ্রমণমূল্য হতে হবে গ্রহণযোগ্য ও বহনযোগ্য এবং কর্মী ব্যবস্থাপনা হবে সামাজিক রীতি-নীতি ও আইনের আলোকে।
অর্থাৎ সামাজিক পর্যটনের সেবাপণ্য উন্নয়ন কৌশল হবে সর্বতোভাবেই জনবান্ধব। ট্যুর অপারেটরগণ এক্ষেত্রে সরবরাহ শিকল ব্যবস্থাপনায় (Supply Chain Management) অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন এবং স্থানীয় সরকারকে প্রত্যক্ষভাবে এগিয়ে এসে সেবাপণ্য উন্নয়নে সহযোগিতা করতে হবে। স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন কাঠামোর ভিতরে একে স্থান না দিতে পারলে সামাজিক পর্যটনের সেবাপণ্য উন্নয়ন, মোড়কীকরণ ও উদ্বুদ্ধকরণ কোনটাই আশানুরূপ ফল এনে দিতে পারবে না। কারণ, এটি যতটা ব্যবসা তার চেয়ে অনেক বেশি উন্নয়ন আকাঙ্খা বাস্তবায়নের কর্মকান্ড।
এক্ষেত্রে ইতালী, পর্তুগাল ও স্পেনের গৃহিত পদক্ষেপ সমূহকে বিবেচনায় আনা যেতে পারে। উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে ইতালীর সংসদে গৃহিত ‘সামাজিক সহযোগিতা বিল’-এর কথা উল্লেখ করার মতো যা আমাদেরকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনী কাঠামোর কথাও মনে করিয়ে দিবে।
সামাজিক পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারের পক্ষ থেকে সুষ্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও সহযোগিতা প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। সামাজিক পর্যটন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলি কোন কাঠামোতে কাজ করবে, সরকারের সহযোগী অংশীদার হিসেবে থাকবে কি না, কিংবা এ জাতীয় পর্যটন যদি অলাভজকভাবে পরিচালিত হয় তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের করকাঠামো তৈরি করা হবে ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডকে সরকারের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ সব বিষয়ে ভাবতে হবে।
আমাদের মতো স্বল্প আয়ের দেশে যেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত-দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে আছে এবং কেবল জীবিকা নির্বাহের তাগিদে অনিবার্য কারণে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাতে করে সামাজিক চিরচেনা বন্ধন প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে এবং সামাজিক মূলধন হ্রাস পাচ্ছে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদগণ সামাজিক মূলধন কমে যাওয়াকে বড় ধরণের বিপর্যয়ের পূর্বাভাস বলে আশংকা করেন। তবে সৌভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে বর্তমানে সামাজিক মূলধনের পরিমাণ অনেক পশ্চিমা উন্নত দেশের চাইতেও বেশি। কিন্তু আধুনিক নাগরিক পেশা ও একক পরিবার ধারণা তা বিনষ্টিকরণের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।
ব্যক্তিপর্যায়ে উৎপাদিত এই দূর্লভ সম্পদ সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের জন্য আমাদেরকে সামাজিক পর্যটনের দ্বারস্থ হতে হবে। জীবন সংগ্রামে নিয়োজিত মানুষদেরকে সমাজ থেকে ছিটকে পড়াকে রোধ করে সমাজের কর্মময়তা ফিরিয়ে আনতে হলে সামাজিক পর্যটনের বিকল্প নাই। সামাজিক পর্যটন সকল মানুষকে সযতনে সমাজের ভেতর রেখে কৌশলগতভাবে উন্নয়ন কর্মকান্ডে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করে। এক্ষেত্রে জীবিকা ও বিনোদনের প্রায়োগিক দিকগুলি খুঁজে বের করে তা অনুশীলন করা গেলে সামাজিক পর্যটনের উপযোগিতাকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করা যাবে।
তাতে শ্রমজীবি সাধারণ মানুষ টেকসই জীবননমান উন্নয়নের নতুন ধারার সাথে সংযুক্ত হতে পারবেন। নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে উদ্ভাবন করতে পারবেন পর্যটনের নতুন কাজ ও পেশা। এদেশের কৃষক, শ্রমিক, সীমিত আয়ের মানুষ, ছাত্র-যুবক ও প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন আকাঙ্খায় সামাজিক পর্যটন কর্মসৃষ্টির নতুন সুযোগ তৈরি করবে যা ভিন্নরূপ জীবনধারা ও জীবনবোধের জন্ম দিবে।
কী হতে পারে সামাজিক পর্যটন আকর্ষণসমূহ? উত্তর হলো: নানাবিধ সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসব, বিশেষ প্রাকৃতিক আকর্ষণ, জীবন-যাপনের বাস্তব রূপ অবলোকন ও সামাজিক সভায় অংশগ্রহণ ইত্যাদি। সারা দেশে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক পর্যটন বাজার গড়ে তুলতে হলে পর্যটন আকর্ষণ সমূহকে বিবেচনায় এনে এর সেবাপণ্য উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। এরূপ ভ্রমণের মেয়াদ হতে পারে ১-৭ দিন। একে ‘সামাজিক ছুটি’ হিসেবেও গ্রহণ করা যেতে পারে। স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে ‘সামাজিক গাইড’ তৈরি করে ট্যুর অপারেটরগণ সামাজিক পর্যটকদেরকে স্থানীয় পর্যায়ে সেবা প্রদান করতে পারেন।
ধরুন, পাবনার একদল লিচুচাষী দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মাধববাটি গ্রামের লিচুচাষীদের উচ্চহারে মানসম্মত লিচুচাষের তথ্যটি জানতে পেরে এর কারিগরি ও বাণিজ্যিক বিষয়াদি দেখতে, বুঝতে ও শিখতে আগ্রহী হলেন। কেননা, উভয় স্থানের কৃষক ও ভূ-প্রকৃতির মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য না থাকা সত্তে¡ও পাবনার কৃষকেরা লিচুচাষে বেশ পিছিয়ে। এই ধরণের পর্যটনে পাবনার লিচুচাষীরা হবেন সামাজিক পর্যটক এবং দিনাজপুরের লিচুচাষীরা হবেন স্বাগত জনগোষ্ঠী। এসব সামাজিক পর্যটকগণ থাকবেন দিনাজপুরের স্বাগত জনগোষ্ঠীর বাড়িতে হোমস্টে পদ্ধতিতে, খাবেনও চাষীদের বাড়িতেই। স্থানীয় সামাজিক পর্যটন গাইড ‘গাইডিং সেবা’ প্রদান করবেন।
একটি সামাজিক পর্যটন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সমস্ত ট্যুর অপারেশন কার্যক্রমে স্থানীয় সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সকল সেবা সরবরাহ করবেন স্বল্প ও ন্যায্যমূল্যে। পাবনার চাষীরা দিনাজপুরের চাষীদের কাছ থেকে লিচু উৎপাদন বিষয়ক সকল কারিগরি প্রশিক্ষণের গ্রহণ করবেন এবং একই সাথে স্থানীয় মানুষের সাথে জীবন সংগ্রামের নানাবিধ সফলতা-ব্যর্থতার মিশ্র তথ্য আদান-প্রদান করবেন। আগত সামাজিক পর্যটক ও স্বাগত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে হবে সাংস্কৃতিক বিনিময়, এক জনগোষ্ঠী জানবেন অন্য জনগোষ্ঠীকে, বাড়বে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, দূর হবে কুসংস্কার ও ভীতি।
আমরা প্রায়শই ছাত্র-যুবাদের জন্য শিক্ষা সফরের আয়োজন করতে দেখি। এর মাধ্যমে যেমন প্রাণিবিদ্যার ছাত্ররা প্রাণিবিদ্যায় জ্ঞান লাভের জন্য কোন বিশেষ স্থানে ভ্রমণ করে। কিন্তু ছাত্রদের জন্য সামাজিক পর্যটন সম্পূর্ণই ভিন্ন। একজন বাংলা সাহিত্যের ছাত্র পাশ করে বাংলা সাহিত্যের সংশ্লিষ্ট কোন পেশার সাথে যুক্ত হবেন এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি তিনি তা পেতে ব্যর্থ হন কিংবা যদি তা না চান তাহলে কী করবেন? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আপাতত এর কোন সদুত্তর নাই।
এবার যদি একদল বাংলা সাহিত্যের ছাত্রকে বগুড়ার মোকামতলার মানুষ কীভাবে খড়ের থালা-বাটি বানিয়ে কিংবা পঞ্চগড়ের ধাক্কামারার কারিগরেরা কীভাবে কাপড়ের টুপি বানিয়ে বিদেশে রপ্তানি করেন তার কৌশল ও ব্যবসার ধরণ হাতে কলমে দেখানো বা শেখানো যায় তাহলে এরা উদ্বুদ্ধ হতে পারেন নতুন কোন কর্মযজ্ঞে নিজেেেদরকে যুক্ত করার। সামাজিক পর্যটন থেকে আহরিত জ্ঞান এই যুবকদের স্বাবলম্বী হতে ও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে প্রেরণা যোগাবে।
একইভাবে স্বল্প আয়ের কর্মচারি যারা প্রতি মূহুর্তেই অনটন থেকে মুক্তির পথ খুঁজছেন, তাদেরকে যদি সপরিবারে এমন কোন স্থানে ভ্রমণ করানো যায় যেখানে পাবেন কিছুটা বিশ্রাম, বিনোদন ও নতুন কর্মসৃষ্টির জ্ঞান। ভাবুন তো কী ঘটতে পারে। নিশ্চয়ই এই প্রান্তিক আয়ের পরিবারগুলি যাত্রা শুরু করবে জীবনের নতুন পথে। জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তির পথে এরাও তৈরি করতে পারে নতুন কোন উদাহরণ।
শারীরিক প্রতিবন্ধী, এসিড বা অন্য কোন সন্ত্রাসে ক্ষতিগ্রস্ত নারী, মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি, এইডস্-এর মতো দূরারোগ্য ব্যাধি ইত্যাদিতে আক্রান্ত মানুষকে যতক্ষণ না কোন অর্থনৈতিক কার্যক্রমের আওতায় আনা যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজ তাদেরকে করুণা করবে কিংবা বোঝা হিসেবে দেখবে। তাই সংগত কারণেই তারা তাদের সৃজনশীলতা দিয়ে অবদান রাখার পরিবর্তে বিচ্যুত হয়ে পড়বে সমাজের মূলধারা থেকে। তাই এদেরকে পছন্দ ও সামর্থ্যমতো কাজ বেছে নেয়ার সুযোগ করে দিয়ে উৎপাদনমুখী কর্মকান্ডে সহজেই সম্পৃক্ত যায় সামাজিক পর্যটন দিয়ে।
সবশেষে আসুন আমাদের বয়োজেষ্ঠ্য মানুষের কথায়। ত্যাগী এসব মানুষ সারাটা জীবন জুড়ে দেয়া-নেয়ার মূল পালা শেষ করেছেন। কিন্তু নিজেদেরকে গুটিয়ে নেননি সবকিছু থেকে। এদের সংখ্যা কম নয়। আমাদের দেশে ষাটোর্ধ এই মানুষের সংখ্যা জনসংখ্যার প্রায় ৮%। অকর্মণ্য বলে আমরা সযতনে দূরে সরিয়ে রাখি এসব কর্মক্ষম মানুষদের। আমাদের এই মানুষেরা একদিকে পারেননা বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে, আবার আর্থিক কারণে পারেননা দলবেঁধে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে। যারা সন্তানদেরকে উপযুক্ত করে গড়েছেন, সমাজ বিনির্মাণ করেছেন আর অবদান রেখেছেন দেশ গড়ায় – তাদের জীবনের বাকী দিনগুলি কর্মমুখর করে রাখলেই তো বড় একটা কাজ হয়। এদের আছে শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও দেবার মানসিকতা। অথচ সেই অর্থে তেমন কিছুই পেতে চান না এঁরা। শুধু দিতে চান মনের আনন্দে।
অন্যদেরকে তাদের কাছাকাছি নিয়ে গেলেই জ্বলে উঠবে সৃষ্টির আরেক শিখা। সামাজিক পর্যটন এক্ষেত্রে এই মানুষেরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই যে, সামাজিক পর্যটন বিশেষ কোন জনগোষ্ঠীর জন্য চিহ্নিত পর্যটন নয়, বরং তা সকলের জন্য। আজকের দিনে সামাজিক পর্যটনের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এর থেকে পুরো ফল পেতে হলে দরকার বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার। ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত মন্ট্রিল কনফারেন্সে সামাজিক পর্যটনের ৩টি বড় চ্যালেঞ্জকে চিহ্নিত করা হয়েছে; এরা হলো সামাজিকতা, টেকসইকরণ ও ঐকমত্য।
বিষয়টি পরিস্কার করা যাক এক এক করে। প্রথমেই প্রশ্নসাপেক্ষ যে, একজন কৃষক কিংবা শ্রমজীবি মানুষ যিনি সদা-সর্বদা অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন, তার বিশ্রাম বিনোদন ও পর্যটনের অধিকারকে কি স্বীকার করে নেয়া হচ্ছে? কর্মকর্তৃপক্ষ ও সমাজ এ অধিকার স্বীকৃতিতে কতখানি অগ্রসর? শ্রমিকের এই অধিকারকে মূল্যায়ন না করা হলে কমে যাবে উৎপাদনশীলতা যা অর্থনীতিতে ফেলবে নেতিবাচক প্রভাব। তাই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ‘সকলের জন্য পর্যটন’ মতবাদকে প্রতিষ্ঠার করতে হবে। উল্লেখ্য যে, অধিকার থাকা সত্তে¡ও ইউরোপের প্রায় ৪০% মানুষ অর্থাভাবে ভ্রমণে যেতে পারেন না। এ অবস্থায় শুধু অধিকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশে এই চিত্র কতখানি আশাপ্রদ হবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। অবশ্য স্থানীয় সরকার, সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পর্যটন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের যৌথ উদ্যোগে এর সমাধান খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানকে কর্মক্ষম রাখার জন্য সরকারের বিশেষ সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা একান্ত জরুরি।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো, সামাজিক পর্যটনের মতো একটি গণপর্যটন কর্মকান্ডকে কীভাবে টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করবে এবং কীভাবে প্রাকৃতিক পর্যটনসম্পদ, শিল্প ও ঐতিহ্য ইত্যাদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণের মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করবে? এর প্রথম উত্তর হলো জাতিসঙ্ঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থা (UNWTO) সামাজিক পর্যটনকে ইতোমধ্যেই টেকসই পর্যটনের অন্যতম উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের মতে, সামাজিক পর্যটন পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়ন-এই ত্রিমুখী ধারায় টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম। এ ছাড়া সামাজিক পর্যটন অবহেলিত প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট সম্পদের পুনরুদ্ধার করে, সম্পদ ঘাটতিপূর্ণ স্থানে সম্পদের সমাবেশ ঘটায়, স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর স্বত্ত¡ার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং বঞ্চনারোধের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখে। সুতরাং সামাজিক পর্যটন গণপর্যটন হলেও তা কোনভাবেই টেকসই পর্যটনের নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
সবশেষ প্রশ্ন, সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টির মাধ্যমে পর্যটনের মানবীয় লক্ষ্যমাত্রাগুলি বাস্তবায়ন করা কীভাবে সম্ভব? দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য সামাজিক পর্যটনকে ধনী ও দরিদ্র মানুষের মাঝখানে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেই জনসমক্ষে এর প্রকৃত রূপ উন্মেচিত হবে। ফলে সুন্দর ও মনোরম পর্যটন দ্বারা বিকল্প সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করে ছোট ছোট গ্রæপকে স্বাগতিক পরিবারের আতিথেয়তায় রেখে পর্যটন পরিচালনা করতে পারলে একটি নবতর পর্যটন ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে বাংলাদেশে। এই মডেল দাঁড় করাতে পারলে ভবিষ্যতে অনেকের জন্য অনুসরণীয় হবে।
যাই হোক, প্রতিকূলতা যতই থাকুক সামাজিক পর্যটনকে কেউ দেখছেন আগামীদিনের পারিবারিক পর্যটন হিসেবে, আবার কেউ দেখছেন ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পর্যটন হিসেবে।
সামাজিক পর্যটন ব্যক্তিকে করে আত্মপ্রত্যয়ী ও পরিবারকে রাখে সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ। পিছিয়ে পড়া মানুষকে সমাজের কাঠামোগত অবস্থার ভিতর রেখে ক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টির মাধ্যমে গড়ে তোলে উৎপাদনশীল মানুষ হিসেবে। অধিকন্তু, মোট সামাজিক মূলধনকে বিনষ্টির হাত থেকে রক্ষা করে। তাই গণমানুষের সফল অংশগ্রহণের মাধ্যমে সামগ্রিক উন্নয়নের প্রকৃত কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করতে হলে রাষ্ট্রসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে সামজিক পর্যটন অনুশীলনের। স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এরূপ সামাজিক প্রয়াস জরুরি।