সরকারি ক্রয়ে ইজিপি গাইডলাইন সবসময় পুরোপুরি অনুসরণ করা হয় না: টিআইবির গবেষণা

 

ঢাকা, ১ আশ্বিন (১৬ সেপ্টেম্বর):  

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক আজ ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘সরকারি ক্রয়ে সুশাসন: বাংলাদেশে ই-জিপি’র কার্যকরতা পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনটি টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা, অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক, মোহাম্মদ রফিকুল হাসান, এবং প্রতিবেদনের গবেষক দল শাহজাদা এম আকরাম, সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি নাহিদ শারমীন, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি মো. শহিদুল ইসলাম, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি প্রণয়ন করেছেন।

টিআইবির সার্বিক পর্যবেক্ষণ অনুসারে, সরকারি ক্রয়ে ইজিপি’র প্রবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এখনো সব প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের ক্রয়ে এর ব্যবহার হচ্ছে না জিপি’র ব্যবহার এখনো ক্রয়াদেশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।

জিপি প্রবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য দুর্নীতি হ্রাস ও কাজের মানের ওপর ইজিপি’র কোনো প্রভাব লক্ষ করা যায় না। ক্রয় প্রক্রিয়া সহজতর হলেও কার্যাদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ, সিন্ডিকেট এখনও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে।

কার্যাদেশ বিক্রি, অবৈধ সাবকন্ট্রাক্ট, কাজ ভাগাভাগির কারণে কাজের মানের ওপর কোনো ইতিবাচক প্রভাব নেই। ইজিপি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো কোনো কোনো কাজে ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইজিপি’র মূল উদ্দেশ্য (অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন) অনেকখানি ব্যাহত হচ্ছে।

ফলে বলা যায় ইজিপি প্রবর্তনের ফলে ম্যানুয়াল থেকে কারিগরি পর্যায়ে সরকারি ক্রয়ের উত্তরণ ঘটলেও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের একাংশ দুর্নীতির নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে। বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা থেকে উত্তরণ ঘটলে ইজিপি’র সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে।

টিআইবির সুপারিশ হচ্ছে: 

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে:

. প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের ক্রয় ইজিপি’র মাধ্যমে করতে হবে।

. জিপি পরিচালনার জন্য কাজের চাপ ও জনবল কাঠামো অনুযায়ী ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে জনবল বাড়াতে হবে।

. জিপি’র সাথে সম্পর্কিত সব অংশীজনকে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এর জন্য প্রতি জেলায় সিপিটিইউ’র তত্ত্বাবধায়নে একটি প্রশিক্ষণ ইউনিট গঠন করতে হবে, যারা মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় পর পর ঠিকাদার, ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

. প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) প্রত্যেক অর্থবছরের শুরুতে তৈরি করতে হবে ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।

জিপি প্রক্রিয়া:

. প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে প্রাকদরপত্র মিটিং নিশ্চিত করতে হবে।

. ঠিকাদারদের একটি অনলাইন ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে যেখানে সকল ঠিকাদারের কাজের অভিজ্ঞতাসহ হালনাগাদ তথ্য থাকবে; কাজের ওপর ভিত্তি করে ঠিকাদারদের আলাদা শ্রেণিবিন্যাস করতে হবে, যা সঠিক ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

. সিপিটিইউএর পক্ষ থেকে একটি সমন্বিত স্বয়ংক্রিয় দরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকতে হবে যা সব সরকারি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করবে।

জিপি ব্যবস্থাপনা:

. সিপিটিইউএর পক্ষ থেকে ইচুক্তি ব্যবস্থাপনা ও কার্যাদেশ বাস্তবায়ন তদারকি ইজিপি’র অধীনে শুরু করতে হবে।

স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকরতা

. প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানকে ইজিপি গাইডলাইন অনুযায়ী নিরীক্ষা করাতে হবে।

১০. দরপত্র সংক্রান্ত সব তথ্য ও সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের জন্য স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশ করতে হবে।

১১. প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের ইজিপি’র সাথে জড়িত সব কর্মকর্তাকর্মচারীর নিজস্ব ও পরিবারের অন্য সদস্যদের আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রতিবছর শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে ও তা প্রকাশ করতে হবে।

১২. প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি করতে হবে এবং এ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। এর জন্য স্থানীয় জনগণের পক্ষ থেকে তদারকির (কমিউনিটি মনিটরিং) চর্চা শুরু করা যেতে পারে। একইভাবে প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিতভাবে গণশুনানি আয়োজন করতে হবে।


বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে যৌথভাবে বাস্তবায়িত ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রিফর্ম প্রজেক্ট টু’ (২০০৮২০১৬) এর অন্যতম উপাদান হিসেবে ইগভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (সংক্ষেপে ইজিপি) প্রবর্তিত হয়।

২০২১ সালের মধ্যে সমস্ত সরকারি পরিষেবা ডিজিটাল করার সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০১১ সালের ২ জুন থেকে সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে ‘সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট’ (সিপিটিইউ) জিপি পোর্টাল চালু করে। একইসাথে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ (ধারা ৬৫) ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ (বিধি১২৮) অনুসারে ‘বাংলাদেশ ইগভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (জিপি) গাইডলাইন ২০১১’ প্রণয়ন করা হয়।

প্রাথমিকভাবে চারটি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ইজিপি বাস্তবায়ন শুরু হয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ (সওজ), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। বর্তমানে ইজিপি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট প্রকল্প (ডিআইএমএপিপিপি) ডিজিটালকরণ চলমান, যা বাস্তবায়নের সময় ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। সব প্রতিষ্ঠানের ইজিপি ব্যবস্থাপনা করছে সিপিটিইউ। এপ্রিল ২০১৯ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী ইজিপি’তে ৪৭টি মন্ত্রণালয়, ২৭টি বিভাগ, ,৩৬২টি সরকারি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান, এবং ৬১,৪১৭টি দরপত্রদাতা নিবন্ধিত রয়েছে। ইজিপি’কে সহজ করার জন্য সিপিটিইউএর উদ্যোগে ইজিপি’র ওপর প্রায় ১৬,০০০ বিভিন্ন অংশীজনকে (ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, ঠিকাদার) প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী সরকারি খাতে সরকারি ক্রয় দুর্নীতির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত। এই খাতে দুর্নীতির জন্য বিশ্বব্যাপী বছরে কমপক্ষে ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়। এর ফলে প্রাক্কলিত অর্থনৈতিক ক্ষতি বার্ষিক জিডিপি’র ১.% এরও বেশি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় বাংলাদেশেও সরকারি ক্রয়ে দুর্নীতি একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি খাত (যেমন বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্য, জলবায়ু অর্থায়ন) ও প্রতিষ্ঠানের (যেমন বাংলাদেশ বিমান, সিএজি, এলজিইডি, পাউবো, এনসিটিবি) ওপর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টার‌্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সম্পন্ন গবেষণায় ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে দুর্নীতির বিভিন্ন ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে, যার ফলে ক্রয় বাজেটের একটি বড় অংশের ক্ষতি (.% থেকে ২৭%) পরিলক্ষিত হয়েছে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে (এসডিজি ২০৩০) “জাতীয় নীতি ও অগ্রাধিকার অনুসারে টেকসইযোগ্য সরকারি ক্রয়কে উৎসাহিত করতে হবে” বলে উল্লেখ করা হয়েছে (লক্ষ্য ১২.)। জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশন অনুযায়ী প্রত্যেক সদস্যরাষ্ট্র দুর্নীতি প্রতিরোধ করার জন্য স্বচ্ছতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নৈর্ব্যক্তিক শর্তবিশিষ্ট সরকারি ক্রয়কাঠামো প্রবর্তন করবে। জাতিসংঘ ও কনভেনশনের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে উপরোক্ত শর্ত পূরণে বাংলাদেশও অঙ্গীকারবদ্ধ।

জিপি প্রবর্তনের প্রায় একদশক পর বাংলাদেশে ইজিপি’র প্রয়োগ ও কার্যকরতার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান কোন মাত্রায় ইজিপি’র চর্চা করছে, সরকারি ক্রয়ের ধরন ও প্রকৃতি বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কিনা, সব সরকারি প্রতিষ্ঠান সব ধরনের ক্রয়ের ক্ষেত্রে ইজিপি ব্যবহার করে কিনা, জিপি বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতাগুলো কী কী, জিপি প্রবর্তন করার ফলে সুশাসনের ক্ষেত্রে কোনো গুণগত পার্থক্য বা উন্নতি হয়েছে কিনা, এর ফলে দুর্নীতি বা অনিয়ম কমেছে কিনা, এবং প্রাপ্ত পণ্য, সম্পাদিত কাজ বা গৃহীত সেবার মানের কোনো উন্নতি হয়েছে কিনা ইত্যাদি বিষয়গুলো জানার প্রয়োজন অনুভূত হয়।

বাংলাদেশে ইজিপি’র ব্যবহার নিয়ে সম্পন্ন বেশিরভাগ গবেষণায় ইজিপি ব্যবহারের ইতিবাচক প্রভাব, ক্রয় প্রক্রিয়ার প্রবণতা ও জনগণের তদারকির প্রভাব আলোচিত হলেও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ইজিপি’র মাধ্যমে সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তার ওপর বিস্তারিত গবেষণার ঘাটতির প্রেক্ষিতে টিআইবি এ গবেষণা সম্পন্ন করেছে।

গবেষণার স্কোর থেকে আরও দেখা যায় সবচেয়ে বেশি নয়টি নির্দেশকে উচ্চ স্কোর পেয়েছে সওজ; এরপরেই রয়েছে আরইবি (ছয়টি নির্দেশকে উচ্চ স্কোর)। মধ্যম স্কোর সবচেয়ে বেশি নির্দেশকে পেয়েছে এলজিইডি ও পাউবো (সাতটি নির্দেশকে)

গ্রেডিং অনুযায়ী সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান সার্বিকভাবে ঘাটতিপূর্ণ। তবে ইজিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং কার্যকরতায় অবস্থান উদ্বেগজনক। যেসব নির্দেশকে অবস্থান উদ্বেগজনক সেগুলো হচ্ছে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা, প্রাকদরপত্র সভা, চুক্তি ব্যবস্থাপনা, কার্যাদেশ বাস্তবায়ন তদারকি, নিরীক্ষা, কর্মচারীদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ, অনিয়ম ও দুর্নীতি, এবং কাজের মান।

ক্ষেত্র ১: প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি স্কোর পেয়েছে সওজ (৭৫%); এর পরেই রয়েছে পাউবো (৬৩%)। দেখা যায় গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সবগুলো প্রতিষ্ঠানেই ইজিপি পরিচালনার জন্য আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, এবং ইজিপি পরিচালনার জন্য আলাদা করে অর্থ বরাদ্দেরও দরকার নেই। ভৌত ও কারিগরি সক্ষমতার দিক থেকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঘাটতি লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে সওজ এবং আরইবি’র সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি।

তবে এলজিইডি (উপজেলা পর্যায়) ও পাউবোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও লজিস্টিকসের ঘাটতি রয়েছে। উপরন্তু, কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ইজিপি পরিচালনায় সমস্যা হয়। কারিগরি সক্ষমতার ক্ষেত্রে পাউবো, আরইবি ও এলজিইডি’তে (উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে) প্রয়োজনের তুলনায় কম কম্পিউটার, সার্ভার স্লো থাকা, ইন্টারনেটের গতি কম থাকা, ব্রডব্যান্ড সংযোগ না থাকার সমস্যা বিদ্যমান। ক্ষেত্র বিশেষে ওয়াইফাই সংযোগ কিংবা অফিস কর্তৃক ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর থাকতে দেখা গেছে।

অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে ঘাটতি লক্ষ করা যায়, যেমন এলজিইডি’র উপজেলা পর্যায়ে ও পাউবো’র কার্যালয়গুলোতে অনুমোদিত পদের বিপরীতে জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এলজিইডি’র অধিকাংশ উপজেলা প্রকৌশলীই একাধিক উপজেলার দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। ক্রয় প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তি, বিশেষকরে ঊর্ধ্বতন কর্র্র্র্মকর্তাদের কম্পিউটারের মাধ্যমে ইজিপি পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবহারিক জ্ঞান বা সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে (যেমন আরইবি)। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অফিসের কম্পিউটার অপারেটররা তাদের হয়ে ইজিপি কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এলজিইডি’র কোনো কোনো উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পায় নি। আরইবি’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কার্যালয় পর্যায়েও প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে।

জিপি গাইডলাইন অনুযায়ী ইজিপি পরিচালনা করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সবসময় পুরোপুরি অনুসরণ করা হয় না। কোনো প্রতিষ্ঠানেই সব ক্রয়ে ইজিপি ব্যবহার করা হয় না। প্রতিষ্ঠানভেদে সর্বনি¤œ ২০% থেকে ৮৫% পর্যন্ত ক্রয় ইজিপি’তে হয় না। জরুরি ভিত্তিতে ক্রয়, আন্তর্জাতিক ক্রয়, কোটেশন প্রদানের অনুরোধ জ্ঞাপন পদ্ধতি, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইজিপি ব্যবহৃত হয় না।

এছাড়া আরইবি’র সমিতি পর্যায়ের ক্রয়ে ইজিপি অনুসরণ করা হয় না। এলজিইডি’র ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দরপত্র ও ক্ষেত্র বিশেষে শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত ক্রয় প্রক্রিয়ায় ইজিপি অনুসরণ করা হয় না। এছাড়া উপজেলা পরিষদের ক্রয়ে অনেক জায়গায়ই ইজিপি পুরোপুরি চালু হয় নি। সামরিক বাহিনীর দ্বারা সম্পাদিত কাজের ক্ষেত্রে ইজিপি অনুসরণ করা হয় না।

কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা দেওয়া হয় না। কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা কত টাকার ক্রয়ের কার্যাদেশ দিতে পারবেন তা ‘ডেলিগেশন অব ফিন্যান্সিয়াল পাওয়ার’ অনুযায়ী সব প্রতিষ্ঠানে নির্ধারণ করা আছে। তবে প্রতিষ্ঠানভেদে এর এই ক্রয়সীমার কিছুটা তারতম্য রয়েছে।

ক্ষেত্র ২: জিপি প্রক্রিয়া

জিপি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি স্কোর পেয়েছে সওজ (৬৪%); এর পরেই রয়েছে পাউবো (৬০%)। ইজিপি গাইডলাইন অনুযায়ী সব ইজিপি ব্যবহারকারীদের ইজিপি ব্যবস্থায় নিবন্ধিত হওয়া বাধ্যতামূলক হলেও তিন ধরনের প্রতিষ্ঠান ইজিপিতে নিবন্ধিত ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার ও ব্যাংক। ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হলেও ঠিকাদারকে নিয়মমাফিক ফি দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। ইজিপি চালুর প্রথম দিকে অধিংকাশ ঠিকাদারই সংশ্লিষ্ট অফিসের সহায়তায় ইজিপিতে নিবন্ধিত হয়েছে, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৬,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটরদের মাধ্যমে ইজিপি আইডি খোলা ও নিবন্ধন সম্পন্ন করেছে। তবে কোনো কোনো ঠিকাদার নিজেই নিবন্ধন করেছে।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সবগুলো প্রতিষ্ঠানে টিইসি গঠন করা হয়। তবে কোনো কোনো সময় টিইসি’র সদস্যদের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটররা তাদের পক্ষে লগইন করে দরপত্র খোলেন। দরপত্র খোলার আগে ঠিকাদারদের পরিচয় গোপন থাকার নিয়ম থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানেই এটি গোপন থাকে না। উপরন্তু, কোনো কোনো কার্যালয়ের অফিসের কম্পিউটার অপারেটররাই টাকার বিনিময়ে ঠিকাদারদের হয়ে দরপত্র দাখিল করে। কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রাকটেন্ডার মিটিং করে না। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সব প্রতিষ্ঠানেই দৈনিক পত্রিকা ও ইজিপি পোর্টালে ক্রয় সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হলেও কিছু কিছু উপজেলার দরপত্র এখনো ইজিপিতে না হওয়ায় সেগুলোর বিজ্ঞাপন ইজিপি পোর্টালে দেওয়া হয় না।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সবগুলো প্রতিষ্ঠানেই নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন কমিটি (টিইসি) গঠন ও দরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। সওজ ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠানে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দরপত্র মূল্যায়ন করা হয় না। মূল্যয়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ঠিকাদারদের জমা দেওয়া কাগজপত্র পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাইবাছাই করার ক্ষেত্রেও ঘাটতি বিদ্যমান। ঠিকাদারদের কোনো ডাটাবেজ না থাকায় তাদের কাজের অভিজ্ঞতা যাচাই ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে করতে হয়। মূল্যায়ন শেষে যে ঠিকাদার সকল বিবেচনায় যোগ্য বিবেচিত হন তাকে কাজের জন্য চূড়ান্ত বাছাই করা হয়। চূড়ান্তভাবে বাছাইয়ের পর ইজিপি সিস্টেমে এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে জানিয়ে দেওয়া হয়।

ক্ষেত্র ৩: জিপি ব্যবস্থাপনা

চুক্তি ব্যবস্থাপনায় ঠিকাদারদের কর্মপরিকল্পনা দাখিল করতে হয়, এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে ঠিকাদারকে ইজিপি চুক্তি ব্যবস্থাপনা টুলস ব্যবহার করতে হয়। তবে ইচুক্তি ব্যবস্থাপনা কোনো প্রতিষ্ঠানেই এখনো বাস্তবায়ন হয় নি। অন্যদিকে কার্যাদেশ বাস্তবায়ন তদারকি প্রক্রিয়াও এখনো ইজিপি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয় নি।

ক্ষেত্র ৪: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রের অধীনে তিনটি নির্দেশকে সবচেয়ে বেশি স্কোর পেয়েছে সওজ (৩০%); এর পরেই রয়েছে এলজিইডি (২৫%)। এই তুলনায় আরইবি (২০%) ও পাউবো’র (১৯%) স্কোর এক্ষেত্রে বেশ কম। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত এলজিইডি ও সওজ কার্যালয়গুলোতে কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা বিদ্যমান। অন্যদিকে পাউবো ও আরইবি’তে অভিযোগ করলেও সমাধান না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই নিয়মিত নিরীক্ষা (বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ) হয়, যার মধ্যে ইজিপির কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত। আবেদনের ভিত্তিতে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সাধারণ জনগণের অভিগম্যতা রয়েছে। তবে ইজিপি গাইডলাইন অনুযায়ী সিস্টেমে অডিট লগ রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানই এটি মেনে চলে না। এছাড়া ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধি ১৯৭৯’ অনুযায়ী সব সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারীদের প্রত্যেক পাঁচবছর অন্তর সম্পদের বিবরণী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দাখিল করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানেরই কর্মকর্তাকর্মচারী সম্পদের তথ্য প্রকাশ করেন না।

ক্ষেত্র ৫: কার্যকরতা

জিপি প্রবর্তনের ফলে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া সহজতর হয়েছে, টেন্ডার বাক্স ছিনতাই, টেন্ডার সাবমিট করতে না দেওয়া, কার্যালয় ঘেরাও করা ইত্যাদি বন্ধ হয়েছে। তবে এগুলো বন্ধ হলেও দুর্নীতি কমার সাথে ইজিপি’র তেমন কোনো সম্পর্ক নেই বলে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই মতপ্রকাশ করেছে। ইজিপি প্রবর্তন সত্ত্বেও নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বিদ্যমান।

রাজনৈতিকভাবে কাজের নিয়ন্ত্রণ ও ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া অভিযোগ রয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় কোনো বিশেষ কাজে কারা টেন্ডার সাবমিট করবে সেটা রাজনৈতিক নেতা বিশেষ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য ঠিক করে দেন। অনেক ক্ষেত্রে একটি বড় লাইসেন্সের অধীনে কাজ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা তার কর্মীদের মাঝে বণ্টন করে দেন।

দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা, নিজেরা কাজ না করে কম্পিউটার অপারেটরদের মাধ্যমে মূল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করানো, নম্বর বাড়িয়েকমিয়ে আনুকূল্য দেওয়া ইত্যাদির অভিযোগ রয়েছে। অফিস কর্মকর্তা কর্তৃক ঠিকাদারদের রেট শিডিউল জানিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অফিসের কম্পিউটার অপারেটরদের সাহায্যে নিয়মবহির্ভূত কাজ করানো হয়।

লিমিটেড টেন্ডার মেথড (এলটিএম)-এ কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ঘুষ আদায় করা অভিযোগ পাওয়া যায়। এছাড়া কাজ তদারকি, অগ্রগতি প্রতিবেদনে ভুল তথ্য দেওয়া, কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বিল তুলতে ঘুষ আদায় করার অভিযোগ রয়েছে।

ঠিকাদারদের মধ্যে যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। ওপেন টেন্ডার মেথড (ওটিএম)-এ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আগে থেকেই সিন্ডিকেট করা থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় ঠিকাদার, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগসাজশের অভিযোগ পাওয়া যায়। এছাড়া অবৈধভাবে কাজ বিক্রি করে দেওয়া বা সাবকন্ট্রাক্ট দেওয়া হয়, এবং একজনের সার্টিফিকেট ও লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ নেওয়া ও অন্য জনের কাজ করা হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে চাঁদা দেওয়া বা দিতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার বাইরের ঠিকাদারদের কাজ করতে না দেওয়াও অভিযোগ রয়েছে।

অনদিকে ইজিপি পদ্ধতিতে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ হওয়ার কারণে ভালো ও দক্ষ ঠিকাদারদের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ফলে কাজ বাস্তবায়নে দুর্নীতি কম হওয়াসহ কাজের মান ভালো হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের অধিকাংশের মতে, জিপি’র সাথে কাজের মানের সম্পর্ক নেই। তথ্যদাতাদের মতে ইজিপি’র কারণে কাজ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও কাজ বিক্রি করার কারণে তা নষ্ট হচ্ছে।

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ইজিপি বাস্তবায়নে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা যায়। প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্রে প্রথমত উপজেলা পর্যায়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভৌত ও কারিগরি সমস্যা বিদ্যমান, যার মধ্যে ইন্টারনেটের কম গতি, লজিস্টিকসের ঘাটতি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি, টেন্ডার ওপেন করার জন্য অপর্যাপ্ত সময় (মাত্র এক ঘণ্টা), ঠিকাদারদের নথিপত্র ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশন করতে হওয়ার ফলে সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

দ্বিতীয়ত, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতির ফলে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের উপর কাজের চাপ বাড়ছে। তৃতীয়ত, দক্ষতার ঘাটতির কারণে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে। চতুর্থত, ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের ইজিপি বাস্তবায়নে ঘাটতি বিদ্যমান, যেমন সম্পূর্ণভাবে ইজিপি অনুসরণ না করা, সব ক্রয় এখনো ইজিপি’তে না করা, প্রকল্পের কাজ পরিবর্তন হওয়ার অজুহাতে এপিপি ওয়েবসাইটে না দেওয়া, এবং প্রাকদরপত্র মিটিং না করা।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় (সিপিটিইউ) পর্যায়ে কিছু সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, সব ঠিকাদারের তথ্য সংবলিত কোনো কেন্দ্রীয় তথ্যভাার এখনো নেই। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় বা সমন্বিত ও স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়ন কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। তৃতীয়ত, দরদাতাদের জন্য সমন্বিত সনদের ব্যবস্থা নেই। চতুর্থত, ক্রয় সংক্রান্ত প্রধান অংশীজন (ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার ও ব্যাংক) জিপিতে নিবন্ধিত হলেও অন্যান্য অংশীজন এখনো নিবন্ধিত নয়। সবশেষে ঠিকাদারদের প্রশিক্ষণও অপর্যাপ্ত।