সমুদ্র পর্যটন ও সুনীল প্রবৃদ্ধি

ঢাকা, ২০ ভাদ্র (৪ সেপ্টেম্বর) :

 মোখলেছুর রহমান:
পৃথিবীর ৭২% পানি থাকলেও সমুদ্রতীর আছে এমন দেশের সংখ্যা খুব বেশি না। সমুদ্রতীরবর্তী দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিমি. এবং সমুদ্রের আয়তন ১,২১,১১০ বর্গ কিমি.। অর্থাৎ আমাদের সমুদ্র দেশের প্রায় ৮২% আয়তনের সমান। এই সমুদ্রের তীর জুড়ে রয়েছে ৭১০ কিলোমিটার সৈকত। এ থেকে বুঝা যায় যে, সমুদ্র পর্যটনে বাংলাদেশের রয়েছে অমিত সম্ভাবনা। উল্লেখ্য যে, পৃথিবীতে দীর্ঘ সৈকতরেখা রয়েছে এমন সবগুলি দেশ অর্থনীতি ও অন্যান্য উন্নয়ন সূচকে এগিয়ে আছে। নিউজিল্যান্ডের রয়েছে ১৫,১৩৪ কি.মি. সৈকতরেখা, যুক্তরাষ্ট্রের ১৯,৯২৪ কি.মি., অস্ট্রেলিয়ার ২৫,৭৬০ কি.মি., জাপানের ২৯,৭৫১ কি.মি., ফিলিপাইনের ৩৬,২৮৯ কি.মি., রাশিয়ার ৩৭,৬৫৩ কি.মি., ইন্দোনেশিয়ার ৫৪,৭২০ কি.মি., নরওয়ের ৫৮,১৩৩ কি.মি.) এবং কানাডার ২,০২,০৮০ কি.মি.। এ থেকে একটি সহজ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে, সমুদ্রকে কাজে লাগাতে সমুদ্র পর্যটন গড়ে তুলতে পারলে আমাদের সুনীল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে যাবে।
সমুদ্র পর্যটনের সংজ্ঞা ও ধারণা:
সমুদ্র পর্যটন ২ (দুই) প্রকার। ক) কোস্টাল ট্যুরিজম ও খ) মেরিটাইম ট্যুরিজম।
ক) কোস্টাল ট্যুরিজম: সমুদ্র তীরকে কেন্দ্র করে বিশ্রাম ও বিনোদনভিত্তিক যে পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তাকে কোস্টাল ট্যুরিজম বা সৈকত পর্যটন বলে। সূর্যস্নান, সমুদ্রের পানিতে বিনোদনমূলক গোছল, সৈকতে হাঁটা, ঘুড়ি উড়ানো, প্যারাগ্লাইডিং, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা, সৈকতে বালুর ভাস্কর তৈরি, সৈকতে ফুটবল বা ভলিবল খেলা, অভিনয় ও সঙ্গীতানুষ্ঠান উপভোগ করা ইত্যাদি এই পর্যটনের আওতাধীন। কোস্টাল ট্যুরিজম বিশ্ব পর্যটনের একটি অন্যতম বৃহত্তম অংশ হিসেবে স্বীকৃত। গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপীয় পর্যটকদের প্রায় ৬০% কোস্টাল ট্যুরিস্ট। বিশেষত যে সকল দেশে সমুদ্র নাই, তারা এই ধরণের পর্যটনে অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়। আমাদের দেশে কক্সবাজার ও কুয়াকাটা প্রধান সমুদ্র সৈকত যা পর্যটকদেরকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। এ ছাড়াও সুন্দরবনের কচিখালী সৈকত, চট্টগ্রামের নৌবাহিনী সৈকত (Neval Beach), পতেঙ্গা সৈকত, হালিশহর সৈকত এবং আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত পার্কি সৈকত কোস্টাল ট্যুরিজমের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোস্টাল ট্যুরিজম কোস্টাল ইকোসিস্টেম এবং সমুদ্র তীরবর্তী বনের বন্যপ্রাণির উপর প্রভাব ফেলতে পারে। সাথে সাথে ভূমির ব্যবহার ও ক্ষয়, সমুদ্র দূষণ এবং সামুদ্রিক সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার সমুদ্রের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কোস্টাল পর্যটন পরিচালনায় পরিবেশ ও সম্পদ রক্ষায় বেশ সতর্ক থাকতে হবে।
খ) মেরিটাইম ট্যুরিজম: সমুদ্রকে কেন্দ্র করে যে পর্যটন তাকে মেরিটাইম ট্যুরিজম বলে। উল্লেখ্য যে, সমুদ্রে নৌকা ও জাহাজে চড়াকে (Boating and Sailing) কেন্দ্র এক পর্যটন তৈরি হয়েছে, তাকে নটিক্যাল ট্যুরিজম (Nautical tourism) বলে। এটিও মেরিটাইম ট্যুরিজমের অংশ। সাঁতার, সার্ফিং, উইন্ডসার্ফিং, ডাইভিং, স্নর্কেলিং, সি-বার্ড ওয়াচিং, জলযানে চড়ে সমুদ্রে ভ্রমণ, নটিক্যাল স্পোর্টস্ ইত্যাদি কার্যাবলি মেরিটাইম ট্যুরিজমের মধ্যে পড়ে। এই পর্যটনে পানিতে ব্যবহার্য অনেক যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়, বিধায় সমুদ্রের টেকসই অবস্থার নিশ্চয়তার জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। তা না হলে এই পর্যটন কোনভাবেই সুনীল অর্থনীতিতে অবদান রাখবে না।
মেরিটাইম ট্যুরিজমের সম্পদসমূহ কতগুলি প্রথাগত পরিবর্তনের সংকটে আছে যেমন বৈশি^ক জলবায়ু পরিবর্তন, অধিক পরিমাণ সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ, সমুদ্রে বর্জ্যরে পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, পানির লবনাক্ততাসহ অনাকাঙ্খিত উপাদানের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং সর্বোপরি মেরিন ইকোসিস্টেমের পরিবর্তন হওয়া ইত্যাদি। এইসব কারণে মেরিটাইম ট্যুরিজম পরিচালনা করা বেশ স্পর্র্শকাতর।
বাংলাদেশে মেরিটাইম ট্যুরিজমের গুরুত্ব
মেরিটাইম ট্যুরিজম সুনীল অর্থনীতির একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ বলে বাংলাদেশে মেরিটাইম ট্যুরিজমের গুরুত্ব অপরিসীম। মেরিটাইম ট্যুরিজমের সাথে নিচের কার্যক্রমগুলি জড়িত:
– পর্যটন যানবাহন: সমুদ্র পর্যটনের জন্য সমুদ্রগামী ভারী জাহাজ এবং মাঝারি ভারী ও হালকা যানবাহনের প্রয়োজন পড়বে। এই সকল যানবাহন আমদানি বা অভ্যন্তরীণভাবে তৈরি, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি অনেক বড় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। আগামী দিনে হয়তো মেরিটাইম ট্যুরিজমের যানবাহনকে কেন্দ্র করে বহু ধরণের সরকারি ও বেসরকারি কারিগরি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে।
– বিনোদন ও ক্রীড়া যন্ত্রপাতি: মেরিটাইম ট্যুরিজমের বিনোদন ও ক্রীড়া যন্ত্রপাতি প্রচুর। এইসব যন্ত্রপাতি আমদানি, অভ্যন্তরীণভাবে তৈরি, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ অনেক বড় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড।
– সমুদ্র এক্যুইরিয়াম: সমুদ্রকে দেখার জন্য সমুদ্রের নিচে এক্যুইরিয়াম ও চিড়িয়াখানা স্থাপন মেরিটাইম ট্যুরিজমের অন্যতম অংশ। এর জন্য কারিগরি ও ব্যবস্থাপনাগত জ্ঞান, বিনিয়োগ, বাজারজাতকরণ ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটকদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য এইরূপ স্থাপনা পৃথিবীর অনেক দেশে আছে।
– সমুদ্র ন্যাচারপার্ক: সমুদ্রকে কেন্দ্র করে ন্যাচারপার্ক স্থাপন করা হতে পারে মেরিটাইম ট্যুরিজমের আরেকটি কার্যক্রম। এইসব ন্যাচারপার্কে পর্যটকগণ প্রাকৃতিক মূলধন যেমন সমুদ্র তীরবর্তী বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণি, পাখি, সমুদ্রের জীবন্ত সম্পদ, সামুদ্রিক খনিজ ও লবন উৎপাদন ইত্যাদি প্রত্যক্ষ করবেন। পর্যটকগণকে আকর্ষণের জন্য এইধরণের পার্ক অত্যন্ত ফলপ্রসু।
– মেরিন হোটেল: সমুদ্রের তীরে কিংবা ভাসমান বহুতলবিশিষ্ট হোটেল এখন বেশ পরিচিত ও সমাদৃত। শুধু তাই নয়, আগামী দিনে সমুদ্রে ভাসমান নগরী তৈরি হবে এবং তাতে মেরিন হোটেল নির্মাণ করা হবে। শুধু তাই নয়, সমুদ্রের নিচে হোটেল নির্মাণের জন্যও পর্যটন প্রযুক্তিবিদগণ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সকল সৃজনশীল পর্যটন আবাসন ব্যবস্থা মেরিটাইম ট্যুরিজমকে ভিন্ন মাত্রা দান করবে এবং অনেক বেশি সমৃদ্ধ করবে।
– মেরিটাইম রেস্টুরেন্ট: মেরিটাইম ট্যুরিজমকে কেন্দ্র করে বেড এন্ড ব্রেকফাস্ট ইন, ফুল সার্ভিস্ড রেস্টুরেন্ট এবং নন্ এলকোহলিক পানীয় বার ইত্যাদি নানা ধরণের রেস্টুরেস্ট তৈরি হতে পারে। আমাদের দেশের মেরিটাইম ট্যুরিজমেও একই ঘটনা ঘটবে আগামী দিনে।
মেরিটাইম ট্যুরিজম সমুদ্রের টেকসই ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার অন্যতম পন্থা। বাংলাদেশে টেকসই কোস্টাল ও মেরিটাইম ট্যুরিজম গড়ে তুলতে হলে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পর্যটন উন্নয়ন, বেসরকারি খাতকে ব্যাপকভাবে যুক্ত করা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আদিবাসীদেরকে কর্মে নিয়োগ এবং সমুদ্রের সম্পদ সুরক্ষায় যৌথভাবে সরকারি ও বেসরকারি পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশে কোস্টাল ও মেরিট্ইাম ট্যুরিজমের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য নিচের তথ্যগুলি উপস্থাপন করা হলো:
– গ্লোবাল কোস্টাল ট্যুরিজম গেøাবাল জিডিপিতে ৫% অবদান রাখে। এখান থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, আমাদের দেশে কোস্টাল ও মেরিটাইম ট্যুরিজমের কী বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
– সাগরে ক্রুজ, ইকো-ডাইভিং, সার্ফিং, বিনোদনমূলক মাছ ধরা, বোটিং, সৈকতে কনসার্ট, ম্যানগ্রুভ ইকোট্যুরিজম, সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে ভ্রমণ এবং ভাসমান রেস্টুরেন্ট ও হোটেল হতে পারে বাংলাদেশের সম্ভাব্য কোস্টাল ও মেরিটাইম ট্যুরিজমের কয়েকটি উল্লেলখযোগ্য কার্যক্রম।
– বর্তমান সময়ে আবর্জনা, কোলাহল, নির্গত বিষাক্ত গ্যাস ও শব্দের আধিক্য নাগরিক জীবনকে দূর্বিসহ করে তুলেছে। এখান থেকে মুক্তির জন্য কোস্টাল ও মেরিটাইম ট্যুরিজমকে ব্যবহার করা যেতে পারে। নাগরিক অস্থিরতা থেকে মুক্তির জন্য এই পর্যটন আগামী দিনে জাতীয় জীবনে অসামান্য ভূমিকা রাখবে।
– বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য আমাদের নীতি নির্ধারকগণ ইতোমধ্যে সুনীল অর্থনীতির প্রতি নজর দিয়েছেন এবং নানা বিষয় বিশ্লেষণ করে দেখছেন। সমুদ্রের জীবন্ত সম্পদ ও খনিজ আহরণ এদের মধ্যে অন্যতম। তবে আনন্দের বিষয় যে, তারা কোস্টাল ও মেরিটাইম ট্যুরিজমকে দ্রæত বধিষ্ণু পর্যটন খাত হিসেবে অভিহিত করেছেন। মেরিটাইম ট্যুরিজমকে পরিপূর্ণ গড়ে তুলতে হলে সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে নটিক্যাল ট্যুরিজমের প্রতি, যা বিশ্রাম ও বিনোদনমুখী সমুদ্র পর্যটন হিসেবে দ্রæত দেশে বিদেশে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
– পৃথিবীর মোট ৬৪টি উপসাগরের মধ্যে বঙ্গোপসাগর সবচেয়ে বড় এবং এর সৈকত নিকটবর্তী এলাকায় বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার মিলে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মানুষের বাস। বাংলাদেশে ৩০ মিলিয়ন মানুষের জীবিকা মৎস্য সম্পদ আহরণ ও সমুদ্রভিত্তিক বাণিজ্যিক পরিবহণের উপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের দেশে কোস্টাল ও মেরিটাইম ট্যুরিজম কতটা গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
মেরিটাইম ট্যুরিজমের সতর্কতা ও সম্ভাবনা
জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ও অ¤øত্ব বৃদ্ধি এবং তলদেশের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া কোস্টাল ট্যুরিজমের ভবিষ্যত উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, মেরিটাইম ট্যুরিজমও প্রাকৃতিক সংকটমুক্ত নয়। নিচে এইসব বিষয় তুলে ধরা হলো:
– জলবায়ু পরিবর্তন সতর্ক করে দিয়েছে যে একুশ শতকের শেষার্ধে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বা তদোর্ধ বেড়ে যাবে। ফলে সমুদ্রের ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব সম্পদের বৈশিষ্ট্যাবলির পরিবর্তন ঘটবে। তাই আগামী দিনে কোস্টাল ও মেরিটাইম ট্যুরিজম ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে।
– প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও দূষণের প্রতি কোস্টাল ও মেরিটাই ট্যুরিজম অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই সমুদ্রের পানির অম্লত্ব বেড়ে যাওয়ার জন্য উদ্ভিদ ও প্রাণিকূলের শারীরবৃত্ত্বীয়, আচরণিক ও প্রজননঘটিত যে পরিবর্তন আসবে, তা কোস্টাল ও মেরিটাই ট্যুরিজমের উপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে। এ সমস্যা মোকাবেলার জন্য এখন থেকেই রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণ করতে হবে।
– আগামী দিনের পর্যটকগণ সৈকতের আইএসও মান রক্ষা, ইকোলজিক্যাল স্টান্ডার্ড ইত্যাদি দেখে কোস্টাল ও মেরিটাই ট্যুরিজমের গন্তব্য বাছাই করবেন। তাই পর্যটনের জন্য উত্তম অবকাঠামো, উপরকিাঠামো এবং সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করলেই কেবল মেরিটাইম ট্যুরিজমের পর্যটক পাওয়া যাবে। দরকার হলে গন্তব্যের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের মান নির্ধারণ করা এবং তা মেনে চলার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
– নটিক্যাল ট্যুরিজমকে সফলতার সাথে পরিচালনার জন্য আগামী দিনে দরকার হবে কতিপয় ক্রজ টার্মিনাল স্থাপন করা। যা সমুদ্রে আগত পর্যটকদেরকে আতিথেয়তা সেবা প্রদান করবে এবং পোর্ট সিটি ভ্রমণে সহযোগিতা করবে। উল্লেখ্য, ভারত গোয়া ও কোচিনসহ বেশ কয়েকটি সৈকত নগরীতে এই ধরণের ক্রুজ টার্মিনাল স্থাপন করা হয়েছে।
– কোস্টাল ও মেরিটাইম ট্যুরিজমের সাথে লাইট হাউজ ট্যুরিজমকে যুক্ত করা যেতে পারে। আমাদের দেশে সৈকতে একটিমাত্র লাইট হাউজ আছে। অন্যদিকে ভারতের সৈকত ঘিরে রেখেছে ১৯০টি লাইট হাউজ। এইসব লাইট হাউজকে কেন্দ্র করে হোটেল, রিসোর্ট, দর্শন গ্যালারি, খেলাধুলা এবং কোস্টাল ট্যুরিজমের অন্যান্য সুবিধাদি গড়ে উঠতে পারে। লাইট হাউজ হতে পারে উদ্ভাবনীমূলক কোস্টাল ট্যুরিজমের আরেকটি শাখা।
সুনীল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি
সুনীল অর্থনীতি মানে টেকসই সমুদ্র অর্থনীতি, যেখানে অর্থনীতির স্বাস্থ্য (Economic wealth), সমুদ্রের বাস্তুস্বাস্থ্য (Health of Ocean Ecosystems) ও তার প্রাকৃতিক সম্পদের অবস্থা হবে ভারসাম্যপূর্ণ এবং সামাজিকভাবে টেকসই।
Economist Intelligence Unit (2015) এক সংজ্ঞায় বলেছে যে, টেকসই সমুদ্র অর্থনীতি মানে ভারসাম্যপূর্ণ সমুদ্রের বাস্তুব্যবস্থা (Ocean Ecosystem) যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে সমর্থন দিতে পারবে এবং সার্বিক সুস্বাস্থ্য বজায় থাকবে।
বিশ্ব ব্যাংকের মতে, সামুদ্রিক সম্পদসমুহের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নত জীবনধারা, কর্মসৃজন এবং সমুদ্রের বাস্তুব্যবস্থা (Ocean Ecosystem) সংরক্ষণের অর্থই সুনীল অর্থনীতি। অন্যকথায়, অর্থনীতি ও জীবনমান উন্নয়নে টেকসই উপায়ে সমুদ্রের সম্পদের ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণকেই সুনীল অর্থনীতি বলে।
সমুদ্রের টেকসই অবস্থা বুঝানোর জন্য বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে, যেমন অটেকসই অর্থে বাদামী (Brown) এবং টেকসই অর্থে নীল (Blue) বা সবুজ।
সমুদ্রের প্রাকৃতিক মূলধন (Ocean’s Natural Capital) বলতে সমুদ্রের পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত প্রাকৃতিক সম্পদসমূহকে (Assets and Resources) বুঝায়। পেট্রোলিয়াম দ্রব্য, খনিজ এবং বাস্তুসম্পদ (Ecosystem Assets) এদের মধ্যে অন্যতম।
সমুদ্র পৃথিবীর জীববৈচিত্র রক্ষা করে এবং মানুষের কর্মসংস্থান, খাদ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রদান করে। অধিকন্তু পৃথিবীকে শীতল রাখে এবং নির্গত মোট কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ৩০% শোষণ করে নেয়।
বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা বহুমাত্রিক যেমন মৎস্য সম্পদের আহরণ, কোস্টাল ও মেরিটাইম ট্যুরিজম এবং শিপিং ইত্যাদি। একে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলে আগামী প্রজন্মের জন্য এক অসীম সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। তবে এর পরিপূর্ণ ফললাভ করতে হলে নিচের বিষয়গুলির প্রতি নজর দিতে হবে এবং সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
– সৈকত সুরক্ষা: জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অভিযোজন ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে সৈকতে বসবাসরত মানুষ এবং সৈকতের প্রাকৃতিক সম্পদসমূহ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
– জীববৈচিত্র সংরক্ষণ: ম্যানগ্রুভ ইকোসিস্টেমসহ (Blue Forests) সকল জীববৈচিত্র ধরে রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই জীববৈচিত্র থেকেই বাস্তুসম্পদ (Ecosystem Assets) ও বাস্তুসেবা (Ecoservice System) তৈরি হয় যা অর্থনীতিতে অবদান রাখে।
– বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: শিল্প ও কৃষি বর্জ্যসহ সকল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ এরা সমুদ্র দূষণ করছে এবং সমুদ্রের মৃত্যু ডেকে আনছে। ফলে সমদ্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হলে কেবল সুনীল অর্থনীতি নয়, বরং সার্বিক ধ্বংস এসে উপস্থিত হবে আমাদের দ্বারপ্রান্তে।
– শক্তি উৎপাদন: সমুদ্রের ঢেউ, বাতাস ও সূর্যালোক থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। এইরূপ শক্তি উৎপাদনে ব্যয় হ্রাস পাবে এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বর্জ্য উৎপাদন কমবে।
– জীবন্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা: মাৎস্য সম্পদ, সমুদ্র তলদেশের সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও প্রাণি ইত্যাদি বাঁচিয়ে রাখার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে সমুদ্রের টেকসই বাস্তু ব্যবস্থাপনা এবং আহরণ উভয়ই সংকটে পড়বে।
– পর্যটন: কোস্টাল ও মেরিটাইম ট্যুরিজমের উন্নয়ন ও অনুশীলন করতে হবে। বাংলাদেশ জলাভূমি পর্যটনের একটি উত্তম গন্তব্য। এর সাথে কোস্টাল ও মেরিটাইম ট্যুরিজমকে যুক্ত করলে পর্যটনের আঙ্গিক কলেবর বৃদ্ধি পাবে এবং তা সুনীল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে যুক্ত হবে।
– শিপিং এবং পরিবহন: শিপিং এবং পরিবহণ আমাদের জন্য অত্যন্ত বিকাশমান একটি খাত। সমুদ্রকে কেন্দ্র করে এই ব্যবসার বিস্তৃতি ঘটাতে পারলে তা সমুদ্র অর্থনীতির আরেকটি উপাদান হিসেবে যুক্ত হবে। তবে এই জাতীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সমুদ্র দূষণ রোধকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
– সমুদ্রভিত্তিক শিল্প স্থাপন: পৃথিবীর যে সকল দেশে সমুদ্র আছে, তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতির আলোকে বাংলাদেশে সমুদ্রভিত্তিক শিল্প স্থাপন করা যেতে পারে। এরই মধ্যে জাহাজ ভাঙ্গা এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশ ভালো করছে। ইপিজেড স্থাপিত হয়েছে। তাই আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিয়ে আরো নতুন নতুন সমুদ্রভিত্তিক শিল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে।
সমুদ্রের অসামান্য সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক সম্পদ ও পর্যটন সেবার বহুমুখীতা তার দিকে সারা পৃথিবীর মানুষকে টানে। তাই বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও পরিবেশগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং পর্যটন এদের প্রত্যেকের সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলছে যে, ২০১১ সালে ইউরোপের দেশগুলি সমুদ্র পর্যটন থেকে আয় করে ১৮৩ বিলিয়ন পাউন্ড, যা তাদের সমুদ্র অর্থনীতির প্রায় ৩৩%-এরর বেশি। পর্যটকদের তখন বর্ধিষ্ণু চাহিদা ছিলো বার্ষিক ২-৩%। এই প্রেক্ষিত বিবেচনা করলে ২০৩০ সালে তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে! অংক যা-ই হোক, একথা পরিস্কার যে আমরাও সমুদ্রে পর্যটন বাস্তবায়ন করতে পারলে তা জিডিপি ও জাতীয় আয়ে আশাতীত অবদান রাখবে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে আনবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সরকার যত দ্রুত ও সহজভাবে এই পর্যটন বাস্তবায়নে উদ্যেগী হবে, তত দ্রুত প্রমাণিত হবে যে পর্যটন দিয়ে বাংলাদেশের ভাগ্য বদলাতে সম্ভব।
[ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য মতে ২০১১ সালে ইউরোপের দেশগুলি সমুদ্র পর্যটন থেকে আয় করেছে মোট সমুদ্র আয়ের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। এ সম্ভাবনা বাংলাদেশেরও রয়েছে।]