মো. খাদেমুল ইসলাম, মনোহরদী প্রতিনিধিঃ
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নার্গিস আক্তারের বিরুদ্ধে সীমাহীন অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। মহিলা সংস্থার সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা আত্মসাৎ, নিয়মিত অফিসে না আসা, প্রশিক্ষণে ভূয়া নাম দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, উৎকোচ ছাড়া সরকারী অনুদানের চেক না দেওয়া, নতুন সমিতির নিবন্ধন করতে মোটা অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণ, আসবাবপত্র ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম, সরকারী বিভিন্ন দিবসের কর্মসূচি পালন না করে অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এসব অনিয়মের অভিযোগ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও অজ্ঞাত কারণে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। সরকারী বিধি অনুযায়ী এক অফিসে ৩ বছরের বেশী দায়িত্ব পালন করার সুযোগ না থাকলেও এই কর্মকর্তা একই অফিসে সাতবছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এই বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজর দিচ্ছেন না। এই কর্মকর্তার খুঁটির জোর কোথায়? এ নিয়ে জনমনে নানা জল্পনা কল্পনা দেখা গেছে। ভূক্তভোগীরা এসব দূর্নীতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাইলে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করেন এবং হয়রানীর ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। নার্গিস আক্তারের বিভিন্ন অনিয়ম ও দূর্নীতির ফিরিস্তি উল্লেখ করে নরসিংদী জেলা প্রশাসক এবং বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ১২জন ভূক্তভোগী।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নার্গিস আক্তার ২০১৩ সালে মনোহরদী উপজেলায় যোগদান করেন। এরপর থেকেই তাঁর নানান অনিয়ম ও অব্যস্থাপনার কারণে কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সেবা প্রত্যাশীরা।
তাছাড়া একই অফিসের অফিস সহায়ক (পিয়ন) রিয়াজ উদ্দিন প্রায় দুই যুগ ধরে এই অফিসে কাজ করে যাচ্ছেন। কর্মকর্তা এবং পিয়ন রিয়াজ মিলে এই অফিসকে দূর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। বিভিন্ন অনুদান এবং ভাতা তুলতে গেলে পিয়ন রিয়াজ উদ্দিনকেও দিতে হয় উৎকোচ।
শাহনাজ পারভিন মিতু নামে এক ভূক্তভোগী জানান, তিনমাস সেলাই প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে ছয় হাজার ৩০০টাকা ভাতা দেওয়ার কথা। কিন্তু গত জানুয়ারী থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রায় অর্ধেক টাকা জোর করে রেখে দিয়েছেন নার্গিস আক্তার। টাকা কম দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি সবাইকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন এবং হয়রানীর ভয় দেখান।

তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হলেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তাছাড়া একই প্রশিক্ষণে রুমা, নাছিমা এবং তাছলিমা নামে তিনজন মহিলার ভূয়া নাম বসিয়ে নিজেই এসব ভাতা উত্তোলন করেছেন এই কর্মকর্তা। প্রতি ব্যাচেই ৫-৭ জনের ভূয়া নাম বসিয়ে নিয়মিতই অর্থ আত্মসাৎ করেন বলে জানিয়েছেন এই ভূক্তভোগী।

তিনি আরো জানান, সেলাই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করতে আসা নারীদেরকে কাঁথা সেলাই করতে বাধ্য করেন নার্গিস আক্তার। পরে এসব কাঁথা ঢাকায় নিয়ে ভালো দামে তিনি বিক্রি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহিলা সমিতির এক নেত্রী জানান, প্রতিবছর মহিলা সমিতির নামে সরকার অনুদান দিয়ে থাকে। এসব অনুদানের চেক উত্তোলন করতে গেলে ৪-৫ হাজার টাকা দিতে হয় কর্তকর্তা নার্গিস আক্তারকে। টাকা কম দিলে সদস্যদেরকে গালাগালি করেন। তাছাড়া নতুন সমিতির নিবন্ধন করতে চাইলে কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয় এই কর্মকর্তাকে। অন্যথায় কাগজপত্র জমা নেন না।

কিশোর কিশোরী ক্লাবের এক জেন্ডার প্রমোটার জানান, উপজেলায় ১৩টি কিশোর কিশোরী ক্লাব রয়েছে। এসব ক্লাবের আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য দুইলাখ ৭১ হাজার টাকা বরাদ্ধ দেয় সরকার। সে হিসেবে ভাগ করলে প্রত্যেক ক্লাবে ২০ হাজার টাকার অধিক আসে। অথচ প্রতিটি কেন্দ্রে একটি ফাইল কেবনেট, একটি ওয়ালক্লথ এবং দুটি প্লাষ্টিকের চেয়ার দেওয়া হয়েছে। যার আনুমানিক সর্বোচ্চ মূল্য হতে পাঁচ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে তিনি মাত্র ৬০-৭০ হাজার টাকার মালামাল ক্রয় করে বাকী সমুদয় অর্থ আত্মসাৎ করেছেন কর্মকর্তা নার্গিস আক্তার।

তাছাড়া গত শোক দিবসের কর্মসূচি পালনের জন্য সরকারীভাবে প্রত্যেক ক্লাবে এক হাজার টাকা করে বরাদ্ধ দেয়। ঐদিন কর্মসূচি পালন না করে এসব টাকাও আত্মসাৎ করেছেন তিনি। আমরা শোক দিবসের কর্মসূচি পালন না করার কারণ জানতে চাইলে এই দিবস পালনের প্রয়োজন নেই বলে তিনি আমাদেরকে জানিয়ে দেন।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নার্গিস আক্তার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে এসব ষড়যন্ত্র। আমি কোন অনিয়ম এবং দূর্নীতির সাথে জড়িত নই।

নরসিংদী জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সেলিনা আক্তার বলেন, মনোহরদী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাছাড়া ইতোমধ্যে ওই অফিসের একজন অফিস সহকারী এবং একজন অফিস সহায়ককে অন্যত্র বদলী করা হয়েছে।