বাংলাদেশের প্রথম পর্যটন গ্রাম বিশ্ব পর্যটন দিবসে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে
মোখলেছুর রহমান:
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার বারবাড়িয়া ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাদেশের এই প্রথম পর্যটন গ্রাম আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে অর্থাৎ বিশ্ব পর্যটন দিবসে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
বাংলাদেশে পর্যটনের প্রকৃত সুফল পেতে হলে কর্পোরেট ট্যুরিজমের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে কমিউনিটি ট্যুরিজম ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে গ্রামের মানুষ কাজ পাবে না, উৎপাদন ব্যবস্থার উৎকর্ষ সাধিত হবে না এবং পল্লী এলাকার মানুষের অর্থ উৎপাদনশীল খাতের পরিবর্তে অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যাবে। আরো একটি বড় ভয়াবহ দিক হলো যেমন কক্সবাজার ও কুয়াকাটার মতো কিছু কিছু ডেসটিনেশন ওভারট্যুরিজমের ভারে নুয়ে পড়বে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এদের জীবনচক্র ডিমিনিস করবে। এর হাত থেকে বাঁচার জন্য আমাদের এখনি উচিত গ্রাম পর্যটনের দিকে নজর দেওয়া। অন্ততপক্ষে প্রত্যেকটি জেলায় একটি করে গ্রামকে পর্যটন গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে তা আমাদের দেশের পর্যটনের জন্য একটি মডেল হতে পারে।
দর্শনতাত্ত্বিক মত:
সৃষ্টিকর্তা আত্মা সৃষ্টি করেন। কিন্তু পর্যটন দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উপাদান ব্যবহার করে জীবন সৃষ্টি করে। প্রাণ পৃথিবীতে আসে দেহে ভর করে। আবার চলে যায় দেহ ত্যাগ করে। পর্যটন মানুষের প্রাণ থেকে সৃষ্টি করে জীবন। অর্থাৎ পর্যটন শিক্ষা, আবেশ ও কর্মময়তা দিয়ে প্রতিটি প্রাণ থেকে জীবন তৈরি করে। প্রতিটি ধর্ম ও দর্শনে প্রাণ নশ্বর। তাই আমরা বলি প্রাণ ত্যাগ করলেন তিনি। কখনো বলি না প্রাণ মারা গেলো। অনেকে বিশ্বাস করেন যে, প্রাণের পুনর্জন্ম হয়। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে, এটি সৃষ্টিকর্তা বা পরমাত্মার কাছে ফিরে যায় নশ্বর দেহ ত্যাগ করে। প্রাণ ত্যাগ করার সাথে সাথে জীবন থেমে যায়। জীবন কর্মের আবদ্ধে নিবেদিত থাকে তার প্রস্তুতি ও প্রতিজ্ঞা দিয়ে। কিন্তু প্রাণ থাকে আলাদা এবং অমর হয়ে।
আত্মা চিরন্তন শক্তি থেকে আসে এবং পর্যটনের মাধ্যমে তা নবরূপ লাভ করে। জীবনের রঙ এবং সুখ সমাজ ও সভ্যতাকে গড়ে তোলে। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট পর্যটন উপাদানগুলি জীবনের অন্তরঙ্গ উপাদান হিসাবে বিবেচিত হয় আত্মাকে জীবনরূপে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। পৃথিবীর প্রতিটি কোণে পর্যটনের সকল উপাদান ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যা মানবজাতির মধ্যে শান্তিপূর্ণ সংহতি এবং শক্তি তৈরি করতে সক্ষম।
প্রাণ যখন দেহের মধ্য দিয়ে আসে, তখন সে চায় নানারূপে গড়ে উঠতে। পৃথিবীর নানা দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উপাদান তাকে এমন অনুপম রূপ দান করে যা তাকে বিশেষ মহিমা ও মর্যাদা দান করে। পর্যটন মানুষের জীবনধারা, আচার, রীতি ইত্যাদি নিরূপণ করে এবং অনুশীলনের মাধ্যমে যুগের পর যুগ ধরে রাখে। এই দর্শনতত্ত্বকে মাথায় রেখে বাংলাদেশের প্রথম পর্যটন গ্রাম হিসেবে চারিপাড়াকে গড়ে তোলা হবে।
পর্যটন গ্রাম কী?
কোন গ্রামকে পর্যটনের মাধ্যমে রূপান্তর (Transformation through tourism)-এর উদ্দেশ্যে পর্যটন অনুগন্তব্য (Tourism micro-destination) হিসেবে তৈরি করলেই তাকে ‘পর্যটন গ্রাম’ বলবো। পর্যটন গ্রাম গড়ে তুলতে পারলে গ্রামে সার্বিক উৎপাদনশীলতা বাড়বে, পণ্যের বহুমুখীকরণ সম্ভব হবে এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। গ্রামের মানুষকে গ্রামে রেখে এইধরণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নাই। পর্যটন গ্রাম পর্যটনসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সেবা ও বহুধরণের নিত্যপণ্য উৎপাদন ও বিপণনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।
পর্যটন গ্রামের প্রয়োজনীয়তা:
আধুনিক পর্যটনের অর্থ হলো পর্যটনকে সাশ্রয়ী ও জীবনমুখী করা। পর্যটনের উপাদানসমূহের উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে জীবনের উৎকর্ষ সাধন করে মানুষের বিশ্রাম, বিনোদন ও শিক্ষার জায়গাকে নিশ্চিত করা যায়। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হলে আমাদেরকে কৃত্রিম পর্যটন সেবা থেকে সরিয়ে এনে প্রাকৃতিক পর্যটন সেবার দিকে ধাবিত করতে হবে। এই পদক্ষেপ পর্যটনের উলম্ব উন্নয়নের পরিবর্তে অনুভূমিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে, যা আমাদের মতো বহু মানুষের দেশে টেকসই উন্নয়নে নিশ্চিত করতে পারে। উল্লেখ্য যে, অনুভূমিক পর্যটন কাঠামো অধিক সংখ্যক কর্মীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।
পর্যটন গ্রামের প্রয়োজনীয়তা পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এখন অনুভূত হচ্ছে এবং করোনা প্রভাবের জন্য অদূর ভবিষ্যতে আরো তীব্রতরভাবে অনুভূত হবে। প্রত্যেকেই নিজেদের সম্পদ ও সংস্কৃতির উপর নির্ভর করে নানা আঙ্গিকে পর্যটন গ্রাম গড়ে তুলছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিচের কারণগুলির জন্য পর্যটন গ্রাম গড়ে তোলা দরকারি-
ক. পর্যটন গ্রাম হবে পরিচ্ছন্ন ও অধিকতর স্বাস্থ্যসম্মত, যা বসবাসের জন্য অধিক উপযোগী।
খ. কৃষকদেরকে সংগঠিত করে গ্রামে জৈবকৃষির সূচনা হবে, যা গণস্বাস্থ্যের নতুন ভিত্তি রচনা করবে।
গ. মানুষ ক্ষুদ্র বিনিয়োগ ও কটেজ আকারের পণ্য ও সেবাশিল্প উৎপাদনে এগিয়ে আসবে।
ঘ. স্বল্পশিক্ষিত মানুষকে প্রায়োগিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদনশীল মানুষে পরিণত করা যাবে।
ঙ. পর্যটন সেবাপণ্য উৎপাদন ও মানসম্মত সাংস্কৃতিক পণ্যায়ন গ্রামের জিডিপিতে উৎকর্ষী অবদান রাখবে।
চ. মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও শিষ্টাচার বৃদ্ধি পাবে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে।
ছ. প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সকলের মধ্য থেকে দারিদ্র্য দূর করবে।
জ. মানুষের মধ্যে শহরে গমন হ্রাস পাবে।
ঝ. গ্রামে প্রচুর পরিমাণে পরোক্ষ ও আবেশিত কর্মসৃষ্টি হবে, যা মানবিক গ্রাম সৃজনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখবে।
ঞ. পর্যটন গ্রামে বাইরে থেকে এবং ব্যাংকগুলি ঋণ প্রবাহ সৃষ্টি করতে চাইবে।
ট. গ্রামে বিশ্বাস, ভালবাসা, সহযোগিতা, ত্যাগ ইত্যাদি জাতীয় সামাজিক পুঁজির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
ঠ. পর্যটন গ্রামগুলি শান্তির গ্রামে পরিণত হবে।
পর্যটন গ্রাম চারিপাড়ার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:
এই গ্রামে নিচের ৬ (ছয়) ধরণের পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
ক. কৃষি পর্যটন: এই ধরণের পর্যটনের মাধ্যমে পর্যটকরা কৃষি উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ইত্যাদিসহ ও কৃষিভিত্তিক বহুমাত্রিক জ্ঞান অর্জন করেন। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়য়ের উদ্দেশ্যে পর্যটকরা কৃষি কার্যক্রমে অংশগ্রহণও করেন ।
খ. খাদ্য পর্যটন: খাদ্যোপাদান ও রন্ধনকৌশলের মাধ্যমে এই এলাকার ঐহিত্য তুলে ধরা হবে। তাই পর্যটকরা গ্রাম ভ্রমণকালে স্থানীয় খাবারের স্বাদ গ্রহণ করে বিশেষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবেন।
গ. সাংস্কৃতিক পর্যটন: ভাটিয়ালি ও ঘাটু গান ও লোক নৃত্যসহ নানা ধরণের লোকজ আচার ও উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হবে চারিপাড়া। যা পর্যটকদেরকে এই গ্রামের প্রতি আকৃষ্ট করবে।
ঘ. জলাভূমি পর্যটন: ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত চারিপাড়া গ্রামে আছে সেখানে জলাভূমি পর্যটনের জন্য পর্যটকরা অবশ্যই যাবেন। এই ধরণের পর্যটনে জলক্রীড়া, নৌভ্রমণ, নৌযানে রাত্রিযাপন ইত্যাদি নানা ধরণের কর্মকান্ড গ্রামীণ পর্যটনে বিশেষ মাত্রা যোগ করতে পারে।
ঙ. আয়ুর্বেদিক পর্যটন: আয়ুর্বেদ পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রাকৃতিক চিকিৎসা, যা এই ভারত উপমহাদেশে সৃষ্টি। উদ্ভিদ, প্রাণি ও খনিজ উপাদান থেকে হিতকর এই চিকিৎসা পদ্ধতি পর্যটন গ্রামে সূচনা করতে পারলে পর্যটকদেরকে তা সহজেই আকৃষ্ট করবে। অনেক মানুষ এই চিকিৎসা গ্রহণের জন্য পর্যটন গ্রামে যাবেন।
চ. জীবনযাত্রা পর্যটন: পর্যটন গ্রাম চারিপাড়ার মানুষেরা কীভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করেন অর্থাৎ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, কৃষি ও বাণিজ্যিক জীবনযাত্রা নির্বাহে তাদের দৃশ্যমান চিত্র কীরূপ করে তা দেখার জন্য উৎসুক পর্যটকরা যাবেন।
ধারাবাহিক কর্মসম্পাদন
পর্যটন গ্রাম চারিপাড়া পরিচালিত হবে বারবাড়িয়া পর্যটন শিল্প সমবায় সমিতি লিমিটেডের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে। তবে এর সার্বিক বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম ফাউন্ডেশন একযোগে কাজ করবে। উপর্যুক্ত লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নের জন্য ৩ (তিন) পর্বে পর্যায়ক্রমে নিচের কাজগুলি সম্পাদন করা হবে।
প্রথম পর্ব
ক) পর্যটনসম্পদ শুমারি ও রিসোর্স ম্যাপিং
খ) পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মডেল তৈরি
গ) পিট কম্পোস্ট ও ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করা
ঘ) জৈব কৃষির মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন
ঙ) নন-হোটেল আবাসন তৈরি
চ) বিনোদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা
ছ) মার্কেটিং মডেল তৈরি
দ্বিতীয় পর্ব
ক) কালিনারি আর্টিস্ট / ফুড ভেন্ডর তৈরি
খ) গাইড, আতিথেয়তা কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি
গ) ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন
ঘ) নার্সারি, ফলপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও চেপা উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা
ঙ) আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা, ওয়েলনেস ও ইয়োগা সেন্টার স্থাপন
চ) কমিউনিটি মার্কেট তৈরি
ছ) সীমিত আকারে আয়ুর্বেদিক ঔষধ উৎপাদন
জ) ডিজিটালাইজেশন
তৃতীয় পর্ব
ক) প্রডাক্ট লাইন তৈরি
খ) পর্যটন রপ্তানি
গ) গ্রামীণ জাদুঘর নির্মাণ
ঘ) প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের মাধ্যমে ঐতিহ্য অনুসন্ধান
ঙ) গবেষণা পরিচালনা
চ) আন্তর্জাতিক বিনিময়
পর্যটনের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়নের ধরণ:
গ্রামীণ উন্নয়নে পর্যটন কৃষি ও অকৃষি কর্মকান্ডের একক ও যৌথ উন্নয়ন ব্যবস্থা যা ঐ এলাকার অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের জীবনমানের অগ্রগতি সাধন এবং প্রকৃতি ও সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধন করে। মজার ব্যাপার এই যে, একমাত্র পর্যটন ছাড়া উন্নয়নের এই বহুমুখীতাকে কাঁধে তুলে নিতে পারে এমন কোন ব্যবস্থা এখনো কেই জানে না। তাই অন্তত নিচের দেড় ডজন কর্মকান্ডের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন সম্ভব বলে আমি মনে করি।
১. কৃষি উন্নয়ন: কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়ন করা হয়। কিন্তু হাল আমলে কৃষির উৎকর্ষ সাধনের জন্য পর্যটনকে যুক্ত করা হয়েছে। চারিপাড়া গ্রামে পর্যটকরা কৃষি খামারে বা কৃষিপণ্য উৎপাদন এলাকায় ভ্রমণ করে কৃষিকার্যে অংশগ্রহণ করবেন, জ্ঞান অর্জন করবেন এবং সরাসরি কৃষিজাত পণ্য ক্রয় করবেন। কৃষি পর্যটনের এই কর্মকান্ড কৃষিকে নতুন মর্যাদা দান করবে ও প্রত্যক্ষভাবে কৃষিপণ্য ক্রয় নিশ্চিত করবে। ফলে গ্রামের কৃষকরা মানসম্মত, নিরাপদ ও জৈব কৃষিপণ্য উৎপাদনে আগ্রহী হবে।
২. খাদ্যসম্পদের উন্নয়ন: প্রতিটি অঞ্চলের খাদ্য ঐ অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তাই চারিপাড়া গ্রামে উৎপাদিত খাদ্যপণ্য দিয়ে স্থানীয় পছন্দ ও স্বাদমতো খাবারের প্রস্তুত করবেন এবং তার অভিজ্ঞতা গ্রহণের জন্য পর্যটকরা ছুটে আসবেন। কেননা, পর্যটকদের কাছে খাবারের এই ভিন্নতা অনেক বড় আকর্ষণ। স্থানীয় খাদ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের সংস্কৃতি ধরে রাখবে চারিপাড়া গ্রাম যা পর্যটকদেরকে নিরন্তর আকর্ষণ করবে।
৩. বাণিজ্যিক উন্নয়ন: আমাদের ধারণা যে, বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিপণনের জন্য শহরের বিকল্প নাই। এই ধারণা ভেঙ্গে দিবে পর্যটন গ্রাম চারিপাড়া। কর্পোরেট বাণিজ্যকে ভেঙ্গে দিয়ে নতুন কমিউনিটি বাণিজ্য সৃষ্টি করার অসাধারণ ক্ষমতা তৈরি করবে এই গ্রাম। এখানে পর্যটনের মাধ্যমে এলাকার মানুষ একত্রিত হয়ে সমবায়ভিত্তিতে কমিউনিটি বাণিজ্যের সূচন করবে। তাদের নিজেদের উৎপাদিত পণ্য ও সেবা সহজেই মধ্যস্থতাকারী ব্যাতিরেকে তুলে দিবে ভোক্তাদের হাতে। এভাবে গ্রামীণ এলাকায় গড়ে উঠবে পর্যটনভিত্তিক বাণিজ্যের।
৪. গ্রামীণ শিল্পোন্নয়ন: প্রাথমিকভাবে চারিপাড়ার স্থানীয় মানুষের চাহিদা পূরণ করবে এমন পণ্যের উৎপাদন করা হবে এখানে। নিরাপদ খাদ্যপণ্য, পশু ও মৎস্য খাদ্য, বায়ো ফার্টিলাইজার, বায়ো ইনসেকটিসাইড, সরিষার তেল, পিঠা, মসলার গুঁড়া, প্রক্রিয়াজতকৃত ফল, সরবত বা জুস, পোষাক, হস্তশিল্প ইত্যাদি ধরণের পরিবেশবন্ধব ক্ষুদ্র ও কমিউনিটি শিল্প স্থাপন করা হবে। পণ্যে মূল্য সংযোজনের উদ্দেশ্যে বৃষ্টির পানি বোতলজাতকরণ ও পর্যটকদের জন্য স্মারক বস্তু তৈরির ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপন করে শিল্প সমৃদ্ধ করা হবে। স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে এবং মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন রীতি দিয়েই তা গড়ে তোলা হবে।
৫. অর্থনৈতিক উন্নয়ন: আমাদের পর্যটন বাংলাদেশের অর্থনীতির ৩% দখল করে আছে। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিতে তার তেমন কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গ্রামীণ পর্যটনের মাধ্যমে কৃষি পণ্যেও পাশাপাশি চারিপাড়া গ্রামে অকৃষি গ্রামীণ পণ্য যেমন নৌকা, পালকি, বাঁশি, বাঁশজাত পণ্য, স্থানীয়ভাবে কমিউনিটি বিনিয়োগ, অথেনটিক খাবারের উৎপাদন কেন্দ্র, ভেষজ উদ্ভিদের চাষ, আয়ুর্বেদিক ওয়েলনেস সেন্টার স্থাপন, গ্রামীণ জাদুঘর স্থাপন ইত্যাদির মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতির পরিবর্তন করা হবে।
৬. সামাজিক উন্নয়ন: চারিপাড়ায় পর্যটনের অনুশীলন শুরু হলে সঙ্গত কারণে কতগুলি পরিবর্তন ঘটবে। যেমন গ্রামটি পরিচ্ছন্ন হবে, মানুষের পোষাক পরিচ্ছেদের গুণগত মান বাড়বে, মানুষের সাধারণ আচরণ পরিবর্তিত হয়ে তাতে সৌজন্যের মাত্রা বাড়বে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সব ধরণের প্রতিষ্ঠানের সেবার মান বাড়বে, দৃশ্যমান সামাজিক অনাচার কমবে এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক পীড়নগুলির অনেকাংশে অবসান ঘটবে। কারণ পর্যটনের কারণে মানুষের অবাধ চলাচল ও স্থানীয় মানুষের সাথে আন্তঃক্রিয়ার জন্য অন্যায়, অনিয়ম ও অনাচারকারীরা অনেকটা পিছু হটবে। এটাই সামাজিক নিয়ম। তাই কেবল পর্যটনের অনুশীলন বাড়িয়ে এখানে সামাজিক সংকট দূরীকরণ ও বহুমাত্রিক সামাজিক উন্নয়নের এক মডেল তৈরি হবে বলে আশা করা যায়।
৭. সাংস্কৃতিক উন্নয়ন: জীবন পরিচালনার সকল পথের সমাহারকে আমরা সংস্কৃতি বলি। অর্থাৎ জীবন পরিচালনার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উপাদানগুলি সংস্কৃতির অংশ। যেমন আমাদের জীবনধারা আমাদের সংস্কৃতি এবং এই জীবনধারা পরিচালানার উপাদান ভাত, শাড়ি, লুঙ্গি, বাংলা গান, নাচ, বাংলা ভাষা ইত্যাদি সবই আমাদের সংস্কৃতির অংশ। শুধু তাই নয়, ধর্ম, জাতীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন, প্রত্নসম্পদ, চিরায়ত চিকিৎসা ব্যবস্থা ইত্যাদি আমাদের সংস্কৃতির অংশ। তাই চারিপাড়া গ্রামে পর্যটনের মাধ্যমে এইসব সংস্কৃতিকে পর্যটকদেও কাছেন তুলে ধরতে পারলে তা কখনো হারিয়ে যাবে না। সাংস্কৃতিক পর্যটনের মাধ্যমে তা সুরক্ষিত হবে এবং উৎকর্ষ সাধিত হবে।
৮. লোকশিল্প উন্নয়ন: লোকশিল্প এমন একটি পর্যটনপণ্য যার মাধ্যমে পর্যটকরা স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্বন্ধে জানতে পারেন। লোকশিল্প মূলত একটি স্থানের ও মানুষের গল্প যা থেকে পর্যটকরা ঐ স্থান দর্শনে ও উক্ত ক্রাফট থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে আগ্রহী হন। লোকশিল্প উৎপাদন যেহেতু বড় আকারে ও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয় না – তাই এর সাথে মানুষের শিল্পজ্ঞান, মেধা ও প্রত্যক্ষ শ্রমের সংশ্লেষ থাকে। পর্যটন গ্রাম চারিপাড়া এইসব সহজেই মানুষের কাছে তুলে ধরবে। এখানকার মানুষের শিল্পসম্মত দক্ষতার প্রকাশ এবং একে সমাজের সৌন্দর্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে। লোকশিল্প ও উৎপাদন দক্ষতা এই গ্রামের মেধাবী সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিকশিত হবে ও তা পর্যটনের মাধ্যমে সম্প্রসারিত হবে।
৯. পরিবেশগত উন্নয়ন: পরিবেশগত উন্নয়নের অর্থ হলো অবকাঠামো নির্মাণ, পারিপার্শ্বিক দৃশ্যপট, সবুজ এলাকা ও গণ-এলাকার উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ ও তার সৃজনশীলতা। গ্রামীণ পরিবেশ উন্নয়নের জন্য পর্যটকে মাথায় রেখে পর্যটন গ্রাম চারিপাড়ার অবকাঠামো উন্নয়ন ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে যেন পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন হয়। পর্যটন ও পরিবেশ একাট্টা হয়ে কাজ করলেই পর্যটনের মাধ্যমে সর্বনিম্ন কার্বন নিঃসরণ করে, উদ্ভিদ, প্রাণি ও অজৈব পরিবেশগত অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব হবে এই গ্রামে। তাই পরিবেশ উন্নয়নের জন্য পরিবেশ পর্যটনের সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা হবে পর্যটন গ্রাম চারিপাড়ায়।
১০. বিলুপ্তপ্রায় সম্পদ সংরক্ষণ: আমাদের দেশের গ্রামীণ এলাকা থেকে ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক উদ্ভিদ, প্রাণি, মানবসৃষ্ট ঐতিহ্যবস্তু ও সাংস্কৃতিক অনুশীলন। শংকার কথা যে, আমরা হারিয়ে ফেলেছি শতাধিক জাতের ধান, অগণিত ভেষজ উদ্ভিদ, দেশি জাতের মাছ, বুনো পাখি এমনকি বাড়ি ঘরের আদি স্থাপত্যকলা, গান, খাবার প্রস্তুতি রীতি ও সংরক্ষণের আদি কৌশল। এইসব সম্পদ পুনরায় ফিরিয়ে আনতে না পারলে আমাদের সংস্কৃতি আগামী দিনে আত্মপরিচয় সংকটে পড়বে। পর্যটনের মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদগুলি ফিরিয়ে এনে এদেরকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও পর্যটকদের কাছে তুলে ধরে জাতিসত্ত্বা ও ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব। এইজন্য পর্যটন গ্রাম চারিপাড়া তার বিলুপ্ত ও বিলুপ্তপ্রায় সম্পদের অনুসন্ধান করবে এবং ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
১১. মানবসম্পদ উন্নয়ন: গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে আমরা অনেকেই মানবসম্পদ বলে মনে করি না। আবার এই জনগোষ্ঠীই আমাদের সার্বিক কৃষি কর্মকান্ড পরিচালনা করে, শ্রমিক হিসেবে বিদেশে গমন করে এবং জিডিপিতে বড় অবদান রাখে। জনসংখ্যার প্রায় ৮০% মানুষকে প্রকৃত মানবসম্পদে পরিণত করার কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। অন্যদিকে এই বিপুল পরিমাণ মানুষকে গড়ে তোলার জন্য এই দেশে এখনো তেমন কোন ব্যবস্থা গড়ে উঠে নাই। এই কাজের সূত্রপাত ঘটানোর জন্য চারিপাড়া গ্রামে পর্যটন জনসম্পদ তৈরি করা হবে। এই ধরণে পদক্ষেপ গ্রামীণ জনবলকে পর্যটনপণ্য ও সেবা উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং সেবা প্রদান এই ৩ ধরণের কাজের জন্য প্রয়োগ করা যাবে। বলা বাহুল্য, এই ধরণের জনবলের দেশে এবং দেশের বাইরে ক্রমবর্ধমান চাহিদা রয়েছে।
১২. শিক্ষাগত উন্নয়ন: পর্যটন শিক্ষা মানেই জীবনমুখী শিক্ষা। গ্রামের মানুষ এখনো প্রাকৃতিক পরিবেশে বসবাস করে বিধায় তাদের প্রায়োগিক শিক্ষা ও জ্ঞান নাগরিক মানুষের চেয়ে বেশি। তাই প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি পর্যটন শিক্ষা এবং পর্যটনের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করা হলে গ্রামের তরুণরা অনেক বেশি উৎপাদনশীল হয়ে উঠতে পারে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শিশুদের জন্য ন্যাচার স্কুলিং এবং পেশাজীবিদেও জন্য খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, গাইডিং, পর্যটন পরিবহন, ভেষজ উদ্ভিদের চাষ, পণ্য ও সেবা বাজারজাতকরণ ইত্যাদি ধরণের প্রায়োগিক শিক্ষা প্রদান করা হবে। ফলে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি পর্যটন শিক্ষা তাদেরকে অনেক বেশি দক্ষ ও কর্মক্ষম করে তুলবে।
১৩. চিরায়ত চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন: চারিপাড়া গ্রামের মানুষের জন্য চিকিৎসা সেবাকে সৃষ্টি করার জন্য ডিপ্লোমা-ইন-আয়ুর্বেদিক মেডিসিন এন্ড সার্জারি (ডিএএমএস) গ্রহণ করার জন্য পাঠানো হবে এবং তাদেরকে দিয়ে ভবিষ্যতে এই গ্রামে একটি আয়ুর্বেদিক হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে। এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন গ্রামের এসএসসি পাশ যুবাদেরকে সম্মানজনক চিকিৎসা পেশায় যুক্ত করবে। অন্যদিকে দেশজ উৎস থেকে তৈরি ঔষধ দিয়ে চিরায়ত পদ্ধতিতে কার্যকর চিকিৎসা জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাবে। এর ফলে গ্রামগুলিতে চিকিৎসা পর্যটনের এক নতুন রূপ আমাদের সামনে উন্মোচিত হবে।
১৪. সামাজিক পুঁজি উন্নয়ন: গ্রামাঞ্চলের মানুষ এখন খুব সীমিত পরিমাণে ব্যাংকের ঋণ, বিস্তর এনজিওর ঋণ এবং তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণের জন্য স্থানীয়ভাবে প্রায় ৩০০%-৭০০% সুদের বিপরীতে ঋণ গ্রহণ করে। এই বাস্তবতার প্রধান কারণ হলো সামাজিক পুঁজির অভাব। সামাজিক বিবর্তনে উদ্ভুত সামাজিক সংকট ও অনাস্থা বৃদ্ধির ফলে আমাদের সমাজে আস্থা, ভালবাসা, যোগাযোগ, নেটওয়ার্ক ইত্যাদি সামাজিক পুঁজির ক্রমাগত ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই সমন্বিভাবে কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে চারিপাড়া গ্রামে সামাজিক পুঁজির পরিমাণ বাড়ানো হবে, যা গ্রামীণ উন্নয়নকে বহুমাত্রিকভাবে অগ্রসর হতে সাহায্য করেবে।
১৫. মানবিক উন্নয়ন: একটি সমাজে সামাজিক পুঁজির ঘাটতি দেখা দিলে মানবিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্থ হয়। চারিপাড়া গ্রামও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে মানবিক উন্নয়নের অভাবে কার্যকর ও টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে না। মমতা, দয়া, স্নেহ, শ্রদ্ধা এই সকল মানবিক গুণাবলি এই গ্রামে টিকিয়ে রাখতে হলে নানামুখী গ্রামীণ পর্যটনের অনুশীলন করতে হবে। চারিপাড়ার সকল মানুষ পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে পর্যটন পরিচালনা করবে এবং তা থেকে প্রত্যেকেই আর্থিক ও সামাজিকভাবে লাভবান হবেন। এই অবস্থা বজায় রাখতে পারলে এই গ্রামের মানুষের মধ্যে মানবিক গুণাবলিগুলি বৃদ্ধি পাবে এবং সার্বিক মানবিক উন্নয়ন সংঘটিত হবে। পর্যটনের এই শক্তিমত্তা দিয়ে মানবিক উন্নয়ন করতে পারলে আগামী দিনের চারিপাড়া একটি মানবিক গ্রামে পরিণত হবে।
১৬. নারী উন্নয়ন: জাতিসঙ্ঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থা বলছে, সারা পৃথিবীতে পর্যটনে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ১৪.৭%। অর্থাৎ পর্যটনে নারীর অংশগ্রহণের ব্যাপক সুযোগ আছে। পর্যটনে নারী ৬ প্রকারে অংশগ্রহণ করে থাকে। ক) কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খ) পর্যটনে শিল্পোদ্যোগ গ্রহণ, গ) পর্যটন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদান, ঘ) পর্যটন কার্যক্রম গ্রহণে নেতৃত্ব প্রদান, ঙ) পর্যটন বিষয়ক নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চ) স্থানীয় সম্প্রদায় ও নাগরিক সমাজ গঠনে পর্যটনের প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ। এই তথ্যকে মাথায় রেখে চারিপাড়া গ্রামের নারীদেরকে পর্যটনের সাথে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রশিক্ষিত প্রদান করা হবে।
১৭. জীবনযাত্রার উন্নয়ন: জীবনযাত্রার উন্নয়ন বলতে মানুষের চিন্তা, দর্শন ও কাজের গুণগত মানোন্নয়নকে বুঝায়। গ্রামীণ মানুষের সার্বিক জীবনযাত্রার উন্নয়নের জন্য পর্যটনকে এখন এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। পর্যটন গ্রাম চারিপাড়া শিক্ষা, উদারতা, চেতনার স্বচ্ছতা, শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণ ইত্যাদি গ্রামের মানুষকে নতুন ও আধুনিক অবয়বে রূপান্তরিত করবে। মানুষের মধ্যে তৈরি করবে পুষ্টি, স্বাস্থ্য, রোগ ব্যবস্থাপনা, জীবনধারার জ্ঞান ইত্যাদি। যা দিয়ে তৈরি হবে একটি নিরোগ ও কর্মময় সমাজ। শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক ব্যাধি দূর হবে ক্রমান্বয়ে। অর্থাৎ পর্যটন গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রাকে খুব সহজে উচ্চমার্গে পৌঁছিয়ে দিতে পারবে যার সমকক্ষ কোন ব্যবস্থা এখনো উদ্ভাবিত হয় নাই।
১৮. টেকসই গ্রামীণ উন্নয়ন: প্রায় সকল উন্নয়নই ভঙ্গুর ও ক্ষণস্থায়ী। তাই টেকসই উন্নয়ন হলো যা কোন অবস্থাতে তার বর্তমান অবস্থান থেকে নিচে নেমে যাবে। এইরূপ উন্নয়ন ব্যবস্থা বিরল। গ্রামীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে তা কীভাবে প্রয়োগ করা যায়, এটা নিয়ে একটু আলোকপাত করা যাক। যেমন কৃষি উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে নিরাপদ কৃষিপণ্য উৎপাদন ও সঠিক বিক্রয়মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটনের মাধ্যমে একটি গ্রামের কৃষি উৎপাদনের মান, পরিমাণ ও মূল্যকে আগাম প্রচার করতে শুরু করলে তা সহজেই ক্রেতাদেরকে আকৃষ্ট করবে। ফলে ক্রেতারা কৃষি প্রযুক্তি স্বচক্ষে দেখার জন্য উক্ত গ্রামে ছুটে যাবেন, তা ভোগ করবেন এবং চূড়ান্তভাবে ঐসব পণ্যের ক্রেতা হবেন। একইভাবে গ্রামীণ অন্যান্য কৃষি ও অকৃষিপণ্য, সংস্কৃতি, আচার, রীতি, উৎসব ইত্যাদি সবই পর্যটকরূপী ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরা যায়। পর্যটন ্রগাম চারিপাড়া এই কাজটি দায়িত্ব নিয়ে করতে চায়।
পর্যটন গ্রাম চারিপাড়া যে সুফলগুলি পাবে:
– কমিউনিটিভিত্তিক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বাড়বে
– গ্রামে কর্মসংস্থান বাড়বে, ফলে শহরমুখিতা কমবে
– পরিমাণ ও মানের দিক থেকে পণ্য ও সেবা উৎপাদন বাড়বে
– গ্রাম থেকে দারিদ্র্য দূর হবে
– পর্যটকদের গ্রামে আগমন বাড়ার ফলে গ্রামে অর্থের আগমন বাড়বে
– গ্রামের সাথে পর্যটকদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন বাড়বে
– গ্রামের মানুষের নিজেদের মধ্যকার কলহ, বিবাদ ইত্যাদি কমবে।
– গ্রামগুলিতে সকল দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের উপায় উদ্ভাবিত হবে
– মানুষ সম্পদের বহুমুখী ব্যবহার করতে শিখবে
– আর্থিক স্বচ্ছলতা বাড়ার জন্য জীবনধারা পরিবর্তিত হবে
– গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলি শক্তিশালী ও কার্যকর হবে।
– জিডিপিতে কৃষির সাথে পর্যটনের সমন্বিত অবদান বাড়বে
– গ্রামের মানুষের জীবনমান বাড়বে
– স্থানীয় সরকারের পর্যটনভিত্তিক কর্মপরিধি বাড়বে ও উন্নয়ন সূচকগুলি পাল্টাবে
– গ্রামীণ অর্থনীতি টেকসই রূপ পরিগ্রহ করবে
– গ্রামে শান্তি স্থাপিত হবে।
সৃজনশীল সংস্কৃতির একটি শক্তি আছে, যা প্রত্যেকটি অঞ্চলে নিহিত। ফলে প্রতিটি জনগোষ্ঠী তাদের সাংস্কৃতিক শক্তি দ্বারা অন্যদেরকে আকৃষ্ট করতে পারে। কারণ প্রত্যেকের সংস্কৃতিই অনুপম ও আলাদা। স্থানীয়ভাবে যা নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনধারার ঐতিহ্য প্রকাশ করে।