প্রতিবন্ধীদের প্রতি যত্নশীল হওয়া জরুরি প্রতিবন্ধী অর্থ এমন এক ব্যক্তি যিনি প্রাকৃতিক অর্থাৎ জন্মগতভাবে অথবা দুর্ঘটনা বা কোন রোগের কারণে শারীরিক ভাবে বিকলাঙ্গ বা মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে স্বাভাবিক জীবন-যাপনে অক্ষম। প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম বিভিন্ন কারণে প্রতিবন্ধী অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রাকৃতিক কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম, বাবা-মা দুজনের মধ্যে রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তা থাকলে, মায়ের বয়স ১৬ বছরের নিচে অথবা ৩০ বছরের উপরে হলে, গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টির অভাব হলে। অন্যদিকে কৃত্রিম কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দুর্ঘটনা, বিষক্রিয়া, প্রসবের সময় সঠিকভাবে যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা।

বর্তমানে পৃথিবীর সকল দেশের প্রতিবন্ধীদের অবস্থান রয়েছে। তবে সব দেশে প্রতিবন্ধীদেরকে একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয় না। প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে প্রথম প্রতিবন্ধকতা আসে পরিবার থেকে। পরিবারের প্রতিবন্ধী সদস্যকে বাকি সদস্যরা সর্বদা লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখতে চায়। শিশুকাল থেকে প্রতিবন্ধীদেরকে সবার থেকে আলাদা করে রাখা হয়। তাদেরকে শিক্ষা-সংস্কৃতি সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয় না। যদিও বর্তমান সরকারের বিশেষ কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের লেখাপড়াসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।

প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে অন্যান্য সমস্যা গুলো আসে সমাজ থেকে। সমাজের মানুষ প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে হাসি-তামাশা, ঠাট্টা বিদ্রুপ করে। এ ধরনের আচরণ প্রতিবন্ধী শিশুদেরকে যেমন মনোকষ্ট দেয় তেমনি পরিবারকে চরমভাবে লজ্জিত করে। এছাড়াও অনেকসময় প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি শারীরিক নির্যাতন করা হয়। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রতি ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রায়ই চোখে পড়ে। এ ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য একদিকে যেমন সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত হওয়া দরকার, অন্যদিকে প্রতিবন্ধীদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেওয়া প্রয়োজন। কোন ব্যক্তি যেমন অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে পছন্দ করে না, তেমনি প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রযোজ্য; প্রতিবন্ধীরাও চায় নিজেরা কিছু করতে। এক্ষেত্রে তাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদেরকে আরো বেশি অনুপ্রাণিত করবে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধীদেরকে তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কিত কাজগুলোতে অভিজ্ঞ করে তুলতে পারলে সহজে তারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারবে।

এছাড়াও স্বাভাবিক ব্যক্তিদের কাজের পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদেরকে সুযোগ দেওয়া দরকার। তাদেরকে কাজের ক্ষেত্রে অক্ষম ভেবে ফেলে রাখলে সমগ্র জনসংখ্যার একটা অংশ নিষ্ক্রিয় থাকবে। তাই প্রতিবন্ধীদেরকে তাদের পরিবেশের উপযোগী কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, প্রতিবন্ধীদের কোন একটা কাজের প্রতি প্রবল আগ্রহ এবং ভালো-লাগা কাজ করে। সে কাজটি করতে তারা সাচ্ছন্দ্যবোধ করে, যেমন অনেকের আগ্রহ থাকে ছবি আঁকা বা কম্পিউটারের কাজ করা অথবা বিশেষ কোন খেলা করা। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের এ বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। পাশাপাশি একজন প্রতিবন্ধী শিশুর ছোটবেলা থেকে যে কাজের প্রতি আগ্রহের পরিচয় দেয়, সে কাজের প্রতি তাকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এভাবে প্রতিবন্ধীদের মন যেমন হাসিখুশি রাখা সম্ভব তেমনি কোন কাজের প্রতি ও আকর্ষিত করা সম্ভব। এভাবে যদি প্রতিটি প্রতিবন্ধী শিশুকে আমরা আত্মনির্ভরশীল রুপে গড়ে তুলতে পারি তাহলে তাদেরকে আর সমাজের জন্য বোঝা মনে হবে না।

প্রতিবন্ধীদেরকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ইতিহাসের পাতায় অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অর্জন বিশেষভাবে লিপিবদ্ধ আছে। যেমন ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন টম হুইটেকার। যিনি একজন প্রতিবন্ধী হয়েও এভারেস্ট জয় করেছেন। এমন হাজার হাজার প্রতিবন্ধীর কথা ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ আছে। প্রতিবন্ধীদেরকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে তাদের থেকে ভালো কিছু পাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে আমাদের প্রথম করণীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন। যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন হয় যে-” যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা।” তাহলে প্রতিবন্ধীদেরকে সমাজের জন্য বোঝা ই মনে হবে। সমাজের সবারই উচিত নিজ অবস্থান থেকে প্রতিবন্ধীদের প্রতি সর্বদা ইতিবাচক থাকা। পাশাপাশি প্রত্যেক পরিবারের উচিত প্রতিবন্ধী সন্তানদেরকে লুকিয়ে না রেখে, শিক্ষা- বিনোদন সহ সকল ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেওয়া। এছাড়াও নিরাপত্তার অভাবে অনেক পরিবারই প্রতিবন্ধীদের কে ঘরের বাইরে বের হতে দিতে চায় না। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী মেয়েদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। এ ধরনের সমস্যা মোকাবেলার জন্য প্রশাসনের যথাযথ ভূমিকা প্রয়োজন। এভাবে সকলের অংশগ্রহণ ও সচেতনতার মাধ্যমে একটি সুন্দর এবং নিরাপদ সমাজ গড়ে উঠুক এটাই সকলের প্রত্যাশা।

মু’তাসিম বিল্লাহ মাসুম
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।