ক্যারিয়ার গঠনে পর্যটন জগতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

 

ঢাকা, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০:

 

“পৃথিবী একটা বই আর যারা ভ্রমণ করেনা তারা বইটি পড়তে পারেনা ।“ – সেন্ট অগাস্টিন
বর্তমানে বিশ্বে নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য শিক্ষার্থীদের বোঝা প্রয়োজন, ভবিষ্যতে সেরা কিছু করার জন্য
কোন পেশায় পা বাড়ালে সেটা হবে সহজ, সাবলীল, শৃঙ্খলামূলক এবং লাভজনক। এ ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ
পেশাটি হচ্ছে পর্যটন শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত অপার সম্ভাবনার বিষয়টি। কারণ নিয়মিত জীবনের একঘেয়েমিতা
দূর করার জন্য দেশে বিদেশের প্রায় সব মানুষ কিছু সময়ের জন্য হলেও ভ্রমণের ইচ্ছা পোষণ করে। আর
তাদেরকে ঘিরেই পর্যটন শিল্পের বিভিন্ন সেবামূলক কাজে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা
নিজেদের ক্যারিয়ার গঠনের জন্য পায় বিপুল সুযোগ ও সম্ভাবণা।

এইচএসসি পরীক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় কোন বিষয়ে স্নাতক পড়বে সেটা নিয়ে হিমশিম খায়।
বিষয় নির্বাচনে নিজের পছন্দের গুরুত্ব তো দিতে হবেই তার পাশাপাশি কোন বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়াতে বেশি
সুবিধা হবে সেটাও খেয়াল রাখা আবশ্যক। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের সকল দেশেই বর্তমানে ট্যুরিজম এর চাহিদা
দিনকে দিন বাড়ছেই। সুতরাং শিক্ষার্থীদের পছন্দ যদি থাকে পর্যটন এবং আতিথেয়তা তাহলে নিঃসন্দেহে সে
এই বিষয়টি বেছে নিতে পারে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেকোন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এই বিষয়ের জন্য
আবেদন করতে পারে। মাত্র চার বছর মেয়াদি কোর্সের পরি থাকছে চাকরির বিশাল সুযোগ সুবিধা। চাইলে
নিজেই হোটেল বা পর্যটন প্রতিষ্ঠান এর মালিক হওয়া যায়। চাকরির অবিরাম সুযোগ সুবিধা এখানে আলোচনা
করা হবে।

পৃথিবীর প্রতিটি দেশই তাদের দেশের সৌন্দর্য,সংস্কৃতি,জীবনযাপন,ইতিহাস,প্রাকৃতিক নয়াভিরাম সারা
বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে চায়। যার মূল গোড়া হবে পর্যটন শিল্প। তাই ভবিষ্যতে এই শিল্পে বিপুল পরিমাণে
দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হবে।

দেখা যাচ্ছে ঢাকায় এখন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আন্তর্জাতিক মানের চেইন হোটেল চালু হচ্ছে। পারিবারিক
বিনোদন কেন্দ্রেগুলোর নতুন অংশ হয়ে উঠেছে রিসোর্ট গুলো। তাই বোঝা যাচ্ছে ভবিষ্যতে বিদেশি ভ্রমণকারীর
সংখ্যা বাড়বে। ভ্রমণকালে তাদের সেব দেয়ার জন্য প্রয়োজন হবে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট
বিভাগের পারদর্শী জনবল। ট্যুরিজম এবং হসপিটালিটি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ এবং কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন
লোকের খুবই অভাব। শুধু দক্ষ জনবলের অভাবে এ খাতে অপার সম্ভাবনা থাকার পরও আমরা শিক্ষার্থীরা
সঠিকভাবে এ খাতে অগ্রগতি করতে পারছি না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ডিআইআইটি ছাড়াও ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সহ কয়েকটি ইউনিভার্সিটিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে
পড়ার সুযোগ আছে। তাই এই সেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্যারিয়ার গড়ার অঢেল সুযোগ থাকছে এই

বিভাগের শিক্ষার্থীদের। বাংলাদেশ বিমান থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানে কেবিন ক্রু,স্টুয়ার্ড
হিসাবে কাজ করছে ট্যুরিজম বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ ছাড়া বাংলাদেশের বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক মানের
হোটেলে সুপারভাইজার পদেও কাজ করছে তারা।

WTTC এর গবেষণা অনুযায়ী ২০২৪ সালের মধ্যে কর্মসংস্থানে পর্যটন খাতের অবদান দাড়াবে ১ দশমিক ৯
শতাংশ। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ১০০ মিলয়নের বেশি মানুষ তাদের জীবন –
জীবিকার জন্য এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এখন প্রতি বছর প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ লাখ পর্যটক দেশের
অভ্যন্তরে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ভ্রমণ করে থাকেন। জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের ফলে সাধারণ মানুষের
কাছে ভ্রমণপিপাষা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে বিধায় আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে
অনন্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশের পর্যটন খাতে সরাসরি ১৫ লক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৩ লক্ষ মানুষ কর্মরত
আছেন। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। পর্যটন
শিল্পের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেল।

এখন এই শিল্পে বহুত কাজের সুযোগ আছে। কারণ একজন পর্যটক এলে ৪ জনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়।
সেই হিসাবে যদি আমাদের দেশে ১ লাখ পর্যটক আসে তাহলে ৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। বাংলাদেশ
পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ প্রতিবেদনে দেখা যায় দেশের কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৪১ শতাংশ
বা প্রায় ৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে পর্যটন খাতে। ২০৫০ সাল নাগাদ ৫১ টি দেশের পর্যটক
আমাদের দেশে আসবে। তখন পর্যটন খাতের অবস্থা কি হবে এ বিষয়ে সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার কোন
দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা নেই।

পর্যটন খাতে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনার অন্যতম কারণ হচ্ছে এ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পৃথিবীর
সবচেয়ে বড় ম্যাংগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রামের
অকৃত্রিম সৌন্দর্য, সিলেটের সবুজ অরণ্য সহ আরো অনেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের
বাংলাদেশ। এছাড়াও রয়েছে সিলেটের জাফলং, চা বাগান,বিছানাকান্দি,বাংলাদেশের হাওর অঞ্চল ইত্যাদি।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত পৃথিবীর একমাত্র দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত যা আর পৃথিবীর অন্য কোথাও
নেই। তাইতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমুদ্রসৈকতের চেয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ
এবং এর রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বর্তমানে কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে নেয়া হয়েছে তিনটি পর্যটন পার্ক
তৈরির পরিকল্পনা। এতে প্রতি বছর বাড়তি ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং
তরুণরা পাবে ককর্মসংস্থানের নতুন সন্ধান।

WTTC এর মতে, বিশ্বের ১৮৪ টি পর্যটন সমৃদ্ধ দেশের মধ্যে র‍্যাংকিংয়ে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের
অবস্থান ছিলো ৬০ নম্বরে। ১০ বছর পর বাংলাদেশ ১৮ তম অবস্থানে চলে আসবে। ফলে জাতীয় আয়ে বড়
অবদান রাখবে উদীয়মান এই শিল্পে। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের মতে ২০১৩ সালে পর্যটন
খাতে ১৩ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত
প্রতিবছর গড়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। সেই হিসেবে ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের

মধ্যে পর্যটন খাতের অবদান দাড়াবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। পর্যটন কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে
৬৮ টি পর্যটন স্পট এবং আবাসনের জন্য সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে ৪০৪ টি তিন তারকা বা তার চেয়ে
আধুনিক হোটেল মোটেল আছে। সংশ্লিষ্টদের অভিমত, এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন করে বিদেশী পর্যটক
আকর্ষণ ও অনুকূল সুবিধা সৃষ্টি করতে পারলেই কক্সবাজার থেকেই বছরে কমপক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকা
রাজস্ব আয় করা সম্ভব। তাই বিজ্ঞ পর্যটকদের অভিমত যথাযথ বিকাশের মাধ্যমে শুধুমাত্র পর্যটন শিল্প
থেকেই বছরে হাজারো কোটি টাকা আয় করতে পারে বাংলাদেশ।

পর্যটন শিল্পে সম্ভাবনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য আরো কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে বলে মনে
করেন বিষেশজ্ঞরা। তাদের মতে বিদেশী পর্যটকদের নির্ভরতা ছাড়াও দেশীয় পর্যটকদের
নিরাপত্তা,যোগাযোগ সুবিধা, আকর্ষণীয় অফার ও পর্যটন ব্যায় সীমার মধ্যে থাকলে দেশের মানুষ আগ্রহ
নিয়ে দেশ ঘুরে দেখতে চাইবে। আর দেশের মানুষকে দেশ দেখানো স্লোগানে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে
পর্যটন শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

তবে অনেকে মনে করেন এই খাত শুধু ট্যুরিজম নিয়ে কাজ করে; কিন্তু কথাটা একদমই অমূলক। এ বিভাগের
ছাত্ররা ভবিষ্যতে দেশের জন্য একটি বড় সম্পদ এমনটাই আশা করেন বড় বড় অভিজ্ঞ শিক্ষকরা। দেশের
প্রতিটি সেক্টরে কাজ করতে পারবে এই বিভাগের ছাত্ররা। যেকোন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানেও কাজ করার সুযোগ
রয়েছে। ট্যুরিজম বিভাগ থেকে পাশ করে অনেক শিক্ষার্থীই সরকারি চাকরি করছে। তাই একজন শিক্ষার্থী
হিসেবে আশা করাই যায়, দক্ষতা গড়ে তুলতে পারলে নানারকম সুযোগই আছে। ড্যাফোডিল ইন্সটিটিউট অব
আইটি পর্যটন বিষয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সম্ভাবনার অসীমধারা নিশ্চিত করনের লক্ষ্যে এই শিল্পে
ব্যাপক ভূমিকা পালন করে আসছে।

জিনাত আয়েশা
ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
ড্যাফোডিল ইন্সটিটিউট অব আইটি