আমার অর্ধশতাধিক বছরের বিরামহীন রাজনৈতিক জীবনে নিজকে, নিজের পরিবারকেই সবচেয়ে বেশী অবহেলা করেছি। জীবনের আসল কাজটিও  অসতর্ক অবহেলার শিকার হয়েছে। আর সেটা হলো আখেরাত এবং অনন্ত জীবনের সঞ্চয়ের হিসাবটা অগোছালোই থেকে গেলো এখন অবদি । কিন্তু জীবন তো যথেষ্ঠ সময় পার করেছে। মহান আল্লাহর অশেষ রহমত পেয়েছি, জীবনে সম্মানিত হয়েছি, সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে, নেক স্ত্রী- সন্তান পেয়েছি। সবই তো আল্লাহর অসীম দয়া। 

কিন্তু রাব্বুল আলামীনের এতো সব রহমত ও নেয়ামতের শোকরিয়া আদায়ে আমার কর্তব্য কি  নিস্পন্ন হয়েছে ?  ক্ষমাহীন অলসতায় পার করেছি জীবনের অঢেল সময়।  রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহে মৃত্যুর ছায়া প্রত্যক্ষ করেছি একাধিক বার  কিন্তু মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে সচেতন হইনি, যথার্থ প্রস্তুতি গ্রহন করিনি। এ যেন নিজেকে নিজেই  ফাঁকি দিয়ে গেলাম।

নিঃসঙ্গ কবরে আমার সাথী হবে কে? অন্ধকারে আলো জ্বালাবে কে? মানুষের নাম- যশ, খ্যাতি, ক্ষমতার দর্প,  সহায়- সম্পদ কিছুই তো তাদের সাথে কবরে যাবেনা। যাবে শুধু আমল। নেক আমল থাকলে কবর আলোকিত হবে।  আখেরাতের দিন কেউ কারো সঙ্গী হবেনা, কেউ কারো সাহায্যে  আসবেনা। বিচার হবে যার যার কর্মফলের।

কিন্তু নেক আমল আমার সঞ্চয়ে কতটা আছে? এবং এই লক্ষে কি আমি যথার্থ  ইবাদত – বন্দেগী করেছি?  এই সব প্রশ্নের ভীর  অাজকাল আমার সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। রাজনীতির পিছনে জীবনের বিরামহীন ৫০ বছরের অধিক সময় কাটিয়ে দিলাম, নিয়ম করে ইবাদত করলামনা। রাজনীতির সাথে তো ইবাদতের মূল স্পিরিট এবং সময়ের কোন কন্ট্রিডিকশন নেই। বরং সৎ রাজনীতি ও নিঃস্বার্থ জনসেবা ইবাদতের শামিল এবং দেশ প্রেম ঈমানের অঙ্গ। আর ইসলাম এক সুশৃংখল জীবনের চাবিকাঠি।

তবু শয়তানের প্ররোচনায় সময়ের কাজটি সময়ে করিনি। আজ ভুলের আবর্ত থেকে বের হয়ে আসার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। এখন ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু পরকালের অনন্ত জীবন। নিদারুন অবহেলায় আখেরাতের সঞ্চয় হীন জীবন আজ পড়ন্ত বিকেলে এসে দাঁড়িয়েছে।  করোনা ভাইরাসের নিয়ম পালনের কারণে জীবনের অখন্ড অবসর আমার এই জ্ঞান চক্ষু খুলে দিয়েছে। ভয়ে বুক কাঁপছে। কি হবে কবরে ও আখেরাতে?

শুধু ভরসা এতোটুকু – পবিত্র কোরআন শরীফে আমাদের মহান রবের পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি রয়েছে ক্ষমার অভয় বাণী—-

“তোমরা নিরাশ হয়োনা। আমি আমার বান্দার প্রতি ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহশীল। তোমরা আমাকে ভয় কর। সৎ কর্ম কর। অসৎ কর্ম ত্যাগ কর এবং তওবা করে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তোমাদের রব অসীম দয়ালু এবং ক্ষমাশীল। যারা সৎকর্মশীল এবং তাকওয়া অবলম্বন করে চলে তাদের জন্য রয়েছে শ্রেষ্ঠ প্রতিদান। আর পাপিষ্ঠদের জন্য অপেক্ষা করছে জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুন। সেই স্হান কতই না নিকৃষ্ট।”

সেই ভরসার জায়গাটাই তো আমার মতো গুনাহ গারদের আশার আলো। যদি ইবাদতে মশগুল হয়ে আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করি তবে অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের ক্ষমা করে দেবেন।

যদি কোরআন শরীফের বাংলা অনুবাদ না পড়তাম তবে কোনোদিন সুনির্দিষ্ট ভাবে আল্লাহ তা’য়ালার এহেন মহানুভবতার কথা জানতেও পারতামনা। কারন কোরআন পাক আমরা আরবীতে তেলওয়াত করি কিন্তু অনেকেই আরবী ভাষা বুঝিনা। জীবনে কত বড় মূর্খ রয়ে গেলাম কোরআন শরীফ বাংলা অনুবাদ না পড়ে। কারণ মহান আল্লাহ আমাদের কি জীবন বিধান নির্দেশ করেছেন তার কোন পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে পারলামনা।

কাকতালীয় ভাবেই আমার রাজনীতিতে আসা। আমাদের ব্বংশ ধারানুযায়ী আমার রাজনীতিতে আসার কথা ছিলনা। কারণ যুগ যুগ ধরে আমাদের পূর্ব পুরুষগন  প্রবল ধর্মীয় অনুভূতি  লালন করে কালাতিপাত করেছেন। ইসলামী জীবনই ছিল তাদের মূল আদর্শ।  আমার প্রপিতামহ পায়ে হেটে পবিত্র হজ্ব পালন করেছেন প্রায় তিন বছর সময় লাগিয়ে। সেই সময়ে এতোটা কষ্ট করেই হজ্ব পালন করতে হতো। ফিরে না আসা পর্যন্ত জানাই যেতোনা হাজী সাহেব বেঁচে আছেন কিনা। এই রক্তধারার উত্তর পুরুষের রাজনীতিতে আসার কি কোন সুযোগ থাকে?

কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল এক সৌখীন গনক ঠাকুরের ভবিষৎ বাণী। তিনি শিশু বয়সে আমার হাত দেখে আমার মাকে বলেছিলেন “তোর ছেলে একদিন মস্ত বড় লীডার হবে” রে। প্রায় ৫৫/৫৬ বছর আগের কথা, এখনো যেন কানে ঝনঝন করে বাজছে বুড়ো দাদুর সেই কথা। আমাদের পাশের গ্রাম মেরাতলির বাসিন্দা ছিলেন সেই হিন্দু ভদ্রলোক ।  পেশায় ছিলেন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার। শশ্রুমন্ডিত ভদ্রলোককে আমার  মা ডাকতেন কাকা বলে, সেই সুবাদে আমার দাদা। আর লোকে ডাকতো বাঙ্গাল ডাক্তার বলে।

ব্বংশীয় জীবন যাত্রায় আমার দাদার আমল ছিল স্চ্ছলতায় ভরপুর। পিতার আমল অভাব- অনটনের যাতনায় বেদনা বিধুর। কিন্তু আমার পিতাই আমার সততার আদর্শ। তিনিই শৈশবে আমার সৎ চেতনার ভিত্তিমূল গড়ে তুলেছিলেন। সময় সুযোগ পেলে আমার বায়োগ্রাফীতে সে ঘটনা প্রবাহ লিখবো।

মার আগ্রহে বাংলা লেখা পড়ার ধারায় রায়পুরা পি. টি. আই এ শিশু শ্রেনীতে নিজের নাম লিখালাম। সেই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের মাধ্যমে শিক্ষা জীবনের  সমাপ্তি।  অনেক কষ্টে মানুষ হয়েছি। অভাবের দিন গুলির কষ্ট বেদনা এখনো স্মৃতিতে ভাস্বর। সবদিন,  সব বেলা পেট ভরে খেতে পাইনি। এই কষ্টই হয়তো আমার অবচেতনে আমার রাজনৈতিক স্বত্ত্বাকে জন্ম দিয়েছে। আর সেই স্বত্বা হলো মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন।

ভালো ছাত্রের সুবাধে রায়পুরা থেকে ব্রাহ্মনবাড়ীয়া গিয়েছিলাম আত্মীয়ের বাড়ীতে থেকে লেখা পড়া করতে। পাকিস্তান আমলে শিক্ষায় অগ্রসরমান কুমিল্লা জেলার অন্যতম সেরা বিদ্যাপিঠ অন্নদা মডেল হাই স্কুলে ভর্তি হলাম। ফাইভে ভালো মানের বৃত্তি পেয়েছিলাম তিন বছরের জন্য। ভালই চলছিল লেখাপড়া।

কিন্তু ষাটের দশকের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে স্কুল ছুটির পর বি, বাড়ীয়া ট্যাংকের পাড়ের পাশের রাস্তা দিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। সেখানে তখন চলছিল জনসভা। মাইকে ভেসে এলো এক বজ্রকন্ঠ। আয়ুব সরকারে বিরুদ্ধে সেকি অগ্নিঝড়া বক্তৃতা যা আমার চেতনাকে নাড়িয়ে দিলো, আমি শিহরিত হলাম। দাঁড়িয়ে পড়লাম বক্তৃতা শুনতে, বক্তার নাম জানতে।  বক্তার নাম জানলাম, তিনি হলেন সর্বকালের  সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখনকার পরিচয় শেখ মুজিব।

পাকিস্তানের প্রসিডেন্ট লৌহমানব আয়ুব খানের বিরুদ্ধে এমন সাহসী বক্তৃতা কেউ করতে পারে এটা ছিলো আমার ধারনার অতীত। সেই বক্তৃতার ঝংকার যেন আমার অবচেতনের সেই মুক্তির স্বপ্নকে জাগিয়ে তুললো। ।  আমার ভিতরে জন্ম নিলো নতুন এক স্বত্ত্বা। যার নাম রাজনীতি। আস্তে আস্তে স্বপ্ন ডানা মেললো।  তারপর থেকে অর্ধশত বছরেরও উপর বিরামহীন পথচলা। পরিপূর্ণ এক রাজনীতিকের অবয়বে আজকের আমি।

গৌরবোজ্জল রাজনীতির এই সুদীর্ঘ জীবনে ঘটনা চক্রে বেশ কয়েক বার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাহচর্যে যাওয়ার আমার সৌভাগ্য হয়েছে। শুনেছি এই মহামানবের কিছু বিরল উক্তি, প্রতক্ষ করেছি অনুসারীদের প্রতি তাঁর মমত্ববোধের ব্যঞ্জনা এবং মোহনীয় ও যাদুকরী ব্যক্তিত্ব। । কোন একদিন হয়তো লিখবো বই আকারে আমার দেখা ঘটনাপঞ্জি নিয়ে। যদি বেঁচে থাকি এবং ছাপানোর সুযোগ থাকে।

আমার প্রাণপ্রিয় নেত্রী, বাংলার রাজনৈতিক গগনের ধ্রুবতারা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা আমাকে যুবলীগের সাধারন সম্পাদক বানিয়ে আমার রাজনৈতিক জীবনের পূর্ণতা এনে দিয়েছেন। এই জন্য মহান আল্লাহ পাকের নিকট আমার অশেষ শোকরিয়া এবং মাননীয় নেত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমার রাজনৈতিক চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ শেখ ফজলুল হক মনি’র। মুক্তিযুদ্ধের সময় আগরতলায় মুজিব বাহিনীর হেডকোয়ার্টার গ্লাস ফেক্টরিতে আমি ওনার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করি।

ব্রাহ্মনবাড়ীয়া আমার রাজনৈতিক সত্বার উন্মেষ স্হল। যদিও বঙ্গবন্ধুকে আমি প্রথম দেখেছি রায়পুরার মেথিকান্দা রেল শ্টেশনে। সালটা সম্ভবত ছিলো ১৯৬৩। তখন আমার শৈশব কৈশোরের বয়ঃসন্ধি কাল। তখনকার তরুন শেখ মুজিব এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ট্রেনে করে চিটাগাং যাচ্ছিলেন। এই ট্রেন মেথিকান্দা থামবে খবর পেয়ে কৌতুহল বশতঃ উনাদের দেখতে টেশনে চলে এসেছিলাম। ওনাদের দেখতে পেয়ে গৌরব বোধ করেছিলাম।

ধর্মীয় চেতনা এবং রাজনীতি উভয়ই আমার জীবনের অস্তিত্বে মিশে আছে। দেহের শিরা- উপশিরার রক্তকণিকায় প্রবাহিত হচ্ছে। ইসলাম আমার জীবন বিধান আর রাজনীতি আমার মানবিক মূল্যবোধ।

আমি সবাইর কাছে দোয়া চাই, আমার যেন ঈমানের সাথে মৃত্যু হয়।  আখেরাত ও  কবরে যেন আল্লাহর ক্ষমা এবং রহমত লাভ করি। আর রাজনীতিতে সততা ও নিঃস্বার্থতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে যেন আমার জীবনবসান হয়।

লেখকঃ মোঃ হারুনুর রশিদ

সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ